এলপিজির দাম নির্ধারিত ১,৫৮৫, বাজারে ২,১০০ টাকা

বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে সরবরাহ ও দামের অসামঞ্জস্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়েও অনেক এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও একই সিলিন্ডারের দাম উঠেছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটে বিকল্প হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর রান্নার ব্যয় আরও বেড়েছে।

চলতি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। ২ সেপ্টেম্বর আগের মাসের তুলনায় দাম ১৩ টাকা কমানো হয়েছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবে অনেক জায়গায় কার্যকর হচ্ছে না। সর্বোচ্চ ২ হাজার ১০০ টাকা দামে বিক্রি হলে ভোক্তাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫১৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে এলপিজির বাজারে দুটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। আমদানিকারক ও অপারেটরদের একাংশ বলছে, দেশে বড় ধরনের মজুত সংকট নেই। অন্যদিকে খুচরা বাজারে গ্রাহকদের অভিযোগ, চাহিদামতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না এবং পেলেও নির্ধারিত দামে কেনা যাচ্ছে না।

আমদানির পরিমাণেও চাপ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মোট আমদানি আগস্টের তুলনায় কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে শুধু আমদানির পরিমাণ দিয়ে বাজারে সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না। ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এলপিজি অপারেটররা জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে জানান, দেশের আমদানি, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। তাদের দাবি, দেশে সামগ্রিকভাবে বড় ধরনের এলপিজি সংকট নেই।

সভায় মন্ত্রীও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলেন। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও গ্রাহক পর্যায়ে যেন সরবরাহ ঘাটতি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে অপারেটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কেউ যেন অসৎ উদ্দেশ্যে এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ আমদানিকারকদের হিসাব ও সরকারি পর্যায়ের মজুতের তথ্য এক ধরনের চিত্র দিলেও বাজারে ভোক্তার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। এই ব্যবধানের কারণ খুঁজে বের করাই এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে কার্গো সংগ্রহে চাপ

আমদানিকারকদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বর্তমান সরবরাহ সংকটের অন্যতম কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজভাড়া ও পরিবহন ব্যয়।

এলপিজি মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হওয়া যেকোনো বড় বাধার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়তে পারে। আমদানিকারকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি থাকার পরও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম পণ্য পাচ্ছে। খোলাবাজার থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত কার্গো সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বাজারে সরবরাহ ধরে রাখতে রেশনিং করছে বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ পর্যাপ্ত কার্গো হাতে না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সব এলাকায় সমানভাবে সিলিন্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বাজারের আরেকটি চাপ তৈরি হয়েছে কার্গো প্রিমিয়াম নিয়ে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এলপিজির মূল্য নির্ধারণের সময় বিইআরসি টনপ্রতি ১৬০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে হিসাব করেছিল। বর্তমানে সেই প্রিমিয়াম বেড়ে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। নির্ধারিত খুচরা মূল্যের মধ্যে এই অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয় করা কঠিন হওয়ায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

একটি এলপিজি কোম্পানির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় কার্গো সংগ্রহ করা। দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একই সময়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ কেউ চুক্তির পুরো পরিমাণ পণ্য না পাওয়ায় বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

আরেকটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সেপ্টেম্বরে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে, যা আগের মাসের তুলনায় কম। উৎপাদক পর্যায় থেকে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাজারেও মজুতের অভিযোগ

শুধু আন্তর্জাতিক সরবরাহ নিয়ে নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ বিতরণব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্য কমে গিয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে এলপিজি কোম্পানিগুলোর পাল্টা অভিযোগ, সরবরাহে কিছুটা চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা সিলিন্ডার মজুত করছেন। পরে বাড়তি দামে সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে আমদানি ও আন্তর্জাতিক সরবরাহের চাপের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের মজুতদারি যুক্ত হয়ে বাজার পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলে কোম্পানিগুলোর দাবি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বরের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছু এলাকায় ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দামের কথাও উঠে এসেছিল।

বড় ভোক্তাবাজার এলপিজির

বাংলাদেশে এলপিজির ব্যবহার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এই জ্বালানি ব্যবহার করেন। মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ যায় গৃহস্থালির রান্নায়। এর বাইরে পরিবহন ও শিল্প খাতেও এলপিজির ব্যবহার রয়েছে।

দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আসে। ফলে এই বাজারের স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করে আমদানিকারকদের কার্গো সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয় এবং দেশের ভেতরে কার্যকর বিতরণব্যবস্থার ওপর।

এ কারণেই আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচলের সমস্যা বা কার্গো সংগ্রহে সামান্য চাপ তৈরি হলেও তার প্রভাব দ্রুত খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পারে। আর শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ বহন করতে হয় ভোক্তাকেই।

আগেও বেড়েছিল দাম

এলপিজির সরবরাহ কমে বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বরেও আমদানি কমে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

বর্তমান পরিস্থিতি এখনও সেই পর্যায়ে না গেলেও বিইআরসির নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের ব্যবধান যথেষ্ট বড়। ১ হাজার ৫৮৫ টাকার নির্ধারিত মূল্যের সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হলে একজন ভোক্তাকে প্রতি সিলিন্ডারে ৫১৫ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। নিয়মিত এলপিজি ব্যবহারকারী একটি পরিবারের জন্য মাসে এক বা একাধিক সিলিন্ডার প্রয়োজন হলে এই অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি পারিবারিক বাজেটে চাপ ফেলছে।

এখন বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি সত্য হলে নির্ধারিত দামে গ্রাহক সিলিন্ডার পাচ্ছেন না কেন। আর আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট যদি মূল কারণ হয়, তাহলে আমদানিকারকেরা ঘাটতি পূরণে কত দ্রুত বিকল্প কার্গো সংগ্রহ করতে পারবেন।

সরকার ইতিমধ্যে অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট ঠেকানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এখন নজর থাকবে বাস্তব বাজারে এর প্রভাব কত দ্রুত পড়ে।

কারণ এলপিজি বাজারে সমস্যাটি শুধু আমদানি বা মজুতের পরিসংখ্যানের নয়। নির্ধারিত দামে একজন সাধারণ গ্রাহক সিলিন্ডার কিনতে পারছেন কি না—শেষ পর্যন্ত সেটিই বাজার পরিস্থিতির সবচেয়ে সরাসরি মাপকাঠি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।