খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
কম দামে পণ্য সরবরাহ করেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অপেক্ষাকৃত সস্তা পোশাক বিক্রি সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যেখানে ভিয়েতনাম চড়া দামে পোশাক বিক্রি করে নিজেদের অবস্থান কেবল টিকিয়েই রাখেনি, বরং আয়ের দিক থেকে প্রবৃদ্ধিও ধরে রেখেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ইইউর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজার থেকে মোট ৪১ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৭০ শতাংশ কম। তবে সামগ্রিক বাজারের এই মন্দা সব দেশের ওপর সমানভাবে প্রভাব ফেলেনি। সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ।
২০১২ সাল থেকে ইইউর বাজারে চীনের পরেই দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। তবে চলতি বছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে ১৬.৪৩ শতাংশ। এই সময়ে বাংলাদেশ ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সঙ্গে কমেছে ইইউর মোট বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব। গত বছরের প্রথমার্ধে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২২.৭৩ শতাংশ, যা চলতি বছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ২১.০৩ শতাংশে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মূল্যের পতন। গত বছরের প্রথমার্ধে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য ছিল ১৫.২৪ ইউরো। চলতি বছর তা ৮.৯৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৩.৮৮ ইউরোয়। তা ছাড়া পরিমাণের হিসাবেও রপ্তানি কমেছে ৮.২২ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের বাজারে পোশাকের পরিমাণ এবং একক মূল্য—উভয়ই একযোগে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে। চলতি বছরের প্রথম প্রথমার্ধে দেশটি ২.০৭ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা পরিমাণের দিক থেকে ১১.৫২ শতাংশ কম হলেও অর্থের অঙ্কে ০.৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ, ভিয়েতনাম প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য পেয়েছে ২৯.৩২ ইউরো, যা বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। গত এক বছরে ভিয়েতনামের পোশাকের গড় দর বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ কম পরিমাণ পণ্য পাঠালেও বেশি মূল্যের (Value-added) বা ম্যান-মেড ফাইবার (কৃত্রিম তন্তু) ভিত্তিক পোশাক তৈরি করে ভিয়েতনাম ভালো মুনাফা অর্জন করছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইইউর পোশাক বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ চীনের বাজার অংশ ছিল ২৮.৮ শতাংশ। চীন এখনো শক্ত অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, এককভাবে জুনে ইইউর সার্বিক তৈরি পোশাক আমদানি ৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি ৬.৫৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে গড় মূল্য কমে যাওয়ায় জুনে মূল্যের হিসাবে প্রবৃদ্ধি এসেছে মাত্র ০.৮৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তুলার মূল্যের অস্থিরতার কারণে কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ মূলত সুতির (কটন) পোশাক তৈরিতে বেশি মনোযোগী, যেখানে ভিয়েতনাম কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) আলোচনার সুবাদে অনেক ক্রেতা তাদের ক্রয়ে ভারতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সংকট, গ্যাসের অপর্যাপ্ত চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিদেশি ক্রেতারা যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
তৈরি পোশাক খাতের এই মন্দাবস্থা কাটিয়ে উঠতে হলে বাংলাদেশকে কেবল সস্তা পোশাকের ওপর ভরসা না করে দ্রুত কৃত্রিম তন্তুর উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও জ্বালানি সংকট দ্রুত নিরসন করা না গেলে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
মন্তব্য