জয়পুরহাটের কালাই থানায় ঢুকে কাঠের বাটাম দিয়ে তিন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগে আসলাম হোসেন (২৮) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার তিন দিন পর গ্রেপ্তার হওয়া আসলামকে বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে পাঠানো হয়েছে। গত ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় থানা চত্বরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আহত তিন পুলিশ সদস্যকে কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার আসলাম হোসেন কালাই উপজেলার থুপসাড়া গ্রামের মুনসুর রহমানের ছেলে। ঘটনার সময় থানার পুলিশ সদস্যরা শারদীয় দুর্গাপূজার দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় হাতে কাঠের বাটাম নিয়ে থানায় প্রবেশ করেন আসলাম। পরে একের পর এক পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালিয়ে থানা চত্বর থেকে পালিয়ে যান বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিচয় জানতে চাইতেই হামলার অভিযোগ
এজাহার অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর আনুমানিক বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আসলাম কালাই থানায় প্রবেশ করেন। সে সময় থানার সেন্ট্রি ডিউটিতে ছিলেন নারী কনস্টেবল স্মৃতি আক্তার। তিনি আসলামের পরিচয় ও থানায় আসার কারণ জানতে চাইলে আসলাম উত্তর দেওয়ার আগেই হামলার ঘটনা ঘটে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আসলাম হাতে থাকা কাঠের বাটাম দিয়ে কনস্টেবল মো. মাহমুদুল হাসান রকির বাম চোয়াল লক্ষ্য করে আঘাত করেন। এতে রকির চোয়াল ফেটে রক্তাক্ত জখম হয়। এরপর তাঁর মাথায় আবারও আঘাত করার চেষ্টা করা হলে রকি সরে গিয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে আসলাম তাঁকে ধাওয়া করেন। আত্মরক্ষার জন্য রকি থানার গোলঘরের পেছনে অবস্থান নেন।
এ সময় থানায় থাকা অন্য পুলিশ সদস্যরা আসলামকে থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি আরও উত্তেজিত হয়ে ড্রাইভিং কনস্টেবল মো. মাসুদ রানার পিঠে কাঠের বাটাম দিয়ে আঘাত করেন। এতে মাসুদ রানার পিঠে ছিলে যাওয়া ও ফোলা জখম হয়।
এসআইয়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে চারটি সেলাই
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আসলামকে আটকানোর চেষ্টা করলে তিনি মামলার বাদী উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আহসান হাবীবের মাথা লক্ষ্য করে আঘাত করেন। আহসান হাবীব ডান হাত দিয়ে আঘাতটি ঠেকানোর চেষ্টা করলে তাঁর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে গুরুতর কাটা জখম হয়। পরে চিকিৎসক ওই আঙুলে চারটি সেলাই দেন।
থানার ভেতরে একের পর এক হামলার ঘটনায় অন্য পুলিশ সদস্যরাও তাঁকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। তবে পরিস্থিতির মধ্যে আসলাম হাতে থাকা কাঠের বাটাম ফেলে দিয়ে অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দৌড়ানোর সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেও তিনি আবার উঠে থানার মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে যান বলে অভিযোগ। এ সময় এএসআই মো. ফিরোজ সুলতানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে ধাওয়া করে আটকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে আটক করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার দৃশ্য থানার সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন দিন পর গ্রেপ্তার, আদালতে পাঠানো
হামলার পর আহত পুলিশ সদস্যদের কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযুক্ত আসলামকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। ঘটনার তিন দিন পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার দুপুরে তাঁকে জয়পুরহাটের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে পাঠানো হয়েছে।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুল আলম বলেন, থানায় ঢুকে এক যুবক পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেন। পরে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তবে হামলার পর আসলাম কীভাবে থানা চত্বর থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ওসি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
থানার নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন
থানার ভেতরে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা এবং হামলাকারীর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, থানা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনগত সহায়তা পাওয়ার জায়গা। সেখানে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, থানায় একাধিক পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকার পরও একজন যুবক কীভাবে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ঘটনাটি শুধু পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়; থানার নিরাপত্তাব্যবস্থা ও জরুরি পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটকানোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
তবে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষ। সিসিটিভি ফুটেজ, আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং মামলার অন্যান্য আলামত তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন আদালতের প্রক্রিয়া ও তদন্তের অগ্রগতির মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।


