কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে মুনিরা বেগম (৫৬) নামের এক নারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী অবসরপ্রাপ্ত টেক্সটাইল প্রকৌশলী সরদার আলী (৫৬) গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ছেলে মোস্তাকিন আলম সুমন (৩৫) পলাতক রয়েছেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ভোরে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পলাশবাড়ি গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে।
নিরাময় কেন্দ্রে নেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে হামলা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুমনের মাদকাসক্তির কারণে তাঁর মা-বাবা এর আগেও কয়েকবার তাঁকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন। তবে প্রতিবারই তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাড়িতে ফিরে আসতেন। সম্প্রতি তাঁকে আবারও একটি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। এ নিয়ে সুমনের সঙ্গে মা-বাবার বিরোধ চলছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার দিন ভোরে সিরাজগঞ্জের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের কর্মীরা সুমনকে নিতে তাঁদের বাড়িতে আসেন। তাঁরা সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় বিষয়টি জানতে পেরে সুমন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাড়িতে থাকা একটি ছুরি দিয়ে মুনিরা বেগমের বুকে উপর্যুপরি আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্ত্রীকে বাঁচাতে সরদার আলী এগিয়ে এলে তাঁকেও পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর সুমন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। আকস্মিক এ হামলায় বাড়িতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে নিরাময় কেন্দ্রের কর্মী ও স্থানীয় লোকজন আহত দম্পতিকে উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মুনিরা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, সরদার আলীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ছেলের মাদকাসক্তিতে বিপর্যস্ত পরিবার
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সুমনের মাদকাসক্তি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল। তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার আশায় মা-বাবা একাধিকবার নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু আগের চেষ্টাগুলো সফল হয়নি। এবার তাঁকে আবারও চিকিৎসার জন্য নেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই এ হামলার ঘটনা ঘটে।
পরিবারের সদস্যদের ওপর সুমনের মাদকাসক্তির প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তা বোঝা যায় তাঁর বড় ভাইয়ের পরিস্থিতি থেকেও। তিনি পেশায় একজন কলেজশিক্ষক। পারিবারিক সূত্রের দাবি, সুমনের আচরণ ও মাদকাসক্তির কারণে বড় ভাইও বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র ভাড়া বাসায় থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
একটি পরিবারে মাদকাসক্তির সমস্যা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবনেই প্রভাব ফেলে না; পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনও বিপর্যস্ত হতে পারে। এ ঘটনায় সেই সংকটের ভয়াবহ দিক সামনে এসেছে। তবে মাদকাসক্তি কোনোভাবেই সহিংসতার বৈধতা দেয় না। ঘটনার দায় নির্ধারণে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এলাকায় শোক ও ক্ষোভ
ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন খলিলগঞ্জ কারিগরি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, “মাদকের সহজলভ্যতার কারণেই আজ তরুণ সমাজ ধ্বংসের মুখে। যে মা ছেলেকে আগলে রেখেছিলেন, আজ তাকেই জীবন দিতে হলো।”
এ ঘটনায় পলাশবাড়ি গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ছেলেকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন মা-বাবা—এমন পরিস্থিতিতে মায়ের মৃত্যু এবং বাবার গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
অভিযুক্তকে ধরতে পুলিশের অভিযান
কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি কামাল হোসেন জানান, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সুমনকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তদন্তের মাধ্যমে হামলার বিস্তারিত ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সহিংস আচরণের আশঙ্কা থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি।
কুড়িগ্রামের এ ঘটনা মাদকাসক্তির কারণে একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা ভয়াবহ বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। এখন নিহত মুনিরা বেগমের পরিবারের জন্য শোকের পাশাপাশি আহত সরদার আলীর চিকিৎসা এবং পলাতক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এবং দায় নির্ধারিত হবে।


