কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বদলে যাচ্ছে ভারতের বীমা খাত

ভারতের বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত নতুন মাত্রা পাচ্ছে। আগে প্রযুক্তির ব্যবহার মূলত অনলাইন সেবা, তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত কাজের স্বয়ংক্রিয়করণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ঝুঁকি নিরূপণ, প্রিমিয়াম নির্ধারণ, দাবি নিষ্পত্তি, জালিয়াতি শনাক্তকরণ ও গ্রাহকসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এআই ভূমিকা রাখছে। এর ফলে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু দ্রুত সেবা দেওয়ার দিকে নয়, বরং তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে।

ভারতের বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসি এরগো জেনারেল ইনস্যুরেন্সের (HDFC ERGO General Insurance) ব্যবসায়িক কৌশলেও এই পরিবর্তন গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা শ্রীরাম নাগানাথনের মতে, প্রযুক্তি এখন আর শুধু ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তাকারী একটি বিভাগ নয়; বরং বীমা ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ ও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

প্রচলিত ব্যবস্থায় বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি পরিমাপ করা হতো মূলত কাজের গতি, পরিচালন ব্যয়, ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং বিদ্যমান প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করার সক্ষমতা দিয়ে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, জেনারেটিভ এআই এবং এআই এজেন্টের উন্নতির ফলে এই ধারণায় পরিবর্তন আসছে। এখন প্রযুক্তি বীমা পণ্যের নকশা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতিকেও প্রভাবিত করছে।

বীমা ব্যবসার ভিত্তি হলো তথ্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ, উপযুক্ত প্রিমিয়াম হিসাব করা এবং দাবি পরিশোধের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়। এআই এই তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় প্রবণতা শনাক্ত করতে পারে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ডিজিটাল সেবা থেকে বুদ্ধিমান ব্যবস্থাপনায়

এইচডিএফসি এরগো কয়েক বছর ধরেই আন্ডাররাইটিং, প্রিমিয়াম নির্ধারণ, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং বীমা দাবির মূল্যায়নে প্রচলিত এআই ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি জেনারেটিভ এআই ও এআই এজেন্টের মাধ্যমে এসব সক্ষমতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

শ্রীরাম নাগানাথনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯৫ শতাংশ বীমা পলিসি ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইস্যু করা হয়। গ্রাহকসেবার প্রায় ৮৮ শতাংশ যোগাযোগও ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এসব যোগাযোগের প্রায় ১০ শতাংশ পরিচালিত হয় এআইয়ের সহায়তায়। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, গ্রাহকসেবায় বুদ্ধিমান প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

প্রতিষ্ঠানটির ‘হিয়ার’ (Here) অ্যাপভিত্তিক সেবাব্যবস্থা এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। নাগানাথনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটির ডাউনলোডের সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। এর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান গ্রাহক নন।

এই প্ল্যাটফর্মের ‘নো ইয়োর পলিসি’ (Know Your Policy) নামের একটি সুবিধায় জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে বীমা পলিসির জটিল বিষয়গুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। গ্রাহকেরা দৈনন্দিন কথাবার্তার মতো করে প্রশ্ন করতে পারেন এবং পলিসির আওতাভুক্ত সুবিধা, প্রাপ্য অর্থ ও ব্যতিক্রমী শর্ত সম্পর্কে ব্যাখ্যা পেতে পারেন।

বীমা পলিসিতে অনেক সময় এমন কারিগরি শব্দ ও শর্ত থাকে, যা সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব হয় না। কোন পরিস্থিতিতে বীমার অর্থ পাওয়া যাবে, কোন ব্যয় পরিশোধযোগ্য এবং কোন ক্ষেত্রে সুবিধা প্রযোজ্য হবে না—এসব বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে পরবর্তী সময়ে দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

এআইভিত্তিক ব্যাখ্যামূলক সেবা গ্রাহককে এসব তথ্য সহজে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তি পলিসির মূল শর্ত পরিবর্তন করে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে মূল নথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কতটা নির্ভুলভাবে তথ্য ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তার ওপর।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষের ভূমিকা থাকছে

বীমা খাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও এইচডিএফসি এরগো প্রযুক্তিটিকে মানবকর্মীদের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে না। বরং মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিয়মিত কাজের চাপ কমানোর উপায় হিসেবে এআইকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

সহজ ও স্বল্পমূল্যের বীমা দাবির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়ার বড় অংশ সম্পন্ন করা সম্ভব। অন্যদিকে, জটিল বা উচ্চমূল্যের দাবি এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিগত পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত ঘটনাগুলোতে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে শুধু তথ্য বিশ্লেষণ নয়, পরিস্থিতি বিবেচনা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও মানবিক বিচারবোধও গুরুত্বপূর্ণ।

এই পদ্ধতিতে পূর্বনির্ধারিত নিয়মে সম্পন্ন করা যায়—এমন কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব ঘটনায় বিস্তারিত যাচাই, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিবেচনা কিংবা গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার প্রয়োজন হয়, সেগুলোতে মানুষের সম্পৃক্ততা বজায় রাখা যায়।

বিশেষ করে দুর্ঘটনা, হাসপাতালে ভর্তি কিংবা অন্য কোনো সংকটের সময় বীমা দাবি করা গ্রাহকেরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে পারেন। তাঁদের জন্য দ্রুত সেবা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ন্যায্য আচরণ, পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও সমান জরুরি।

তাই এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার শুধু কাজের গতি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে কর্মীদের সময় সাশ্রয় করে তাঁদের এমন কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য, যেখানে অভিজ্ঞতা ও মানবিক বিবেচনা অপরিহার্য।

দাবি নিষ্পত্তি ও জালিয়াতি শনাক্তকরণে এআই

বীমা খাতে এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো দাবি নিষ্পত্তি। প্রতিষ্ঠানগুলোকে একদিকে প্রকৃত গ্রাহকদের বৈধ দাবি দ্রুত যাচাই ও পরিশোধ করতে হয়, অন্যদিকে সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রাখতে হয়। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বীমা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এইচডিএফসি এরগো ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মোটরবীমার দাবির ক্ষেত্রে জমা দেওয়া ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে প্রচলিত এআই মডেল ব্যবহার করছে।

প্রতিষ্ঠানটির বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রাহকেরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একটি লিংক পেতে পারেন, যার সাহায্যে স্মার্টফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির ছবি তোলা যায়। পরে এআই মডেল ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে ক্ষতির ধরন সম্পর্কে প্রাথমিক মূল্যায়ন তৈরি করে। এই মূল্যায়ন জরিপকারীদের ক্ষয়ক্ষতি বুঝতে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করে।

এ পদ্ধতিতে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সহজ করা যায়। পাশাপাশি গ্রাহকের পরিচিত ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করায় প্রক্রিয়াটি আরও সুবিধাজনক হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটি ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সক্ষমতা বাড়াতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের সম্ভাবনাও যাচাই করছে। স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তিমূলক প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে এআই এজেন্টের ব্যবহার বিবেচনা ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে জটিল দাবি এবং সংবেদনশীল গ্রাহকসেবায় মানবকর্মীদের সম্পৃক্ততা বজায় থাকছে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজ দাবিগুলো কম ধাপে নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে নেওয়া এবং সন্দেহজনক ঘটনাগুলোকে অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য আলাদা করা সম্ভব হতে পারে। এতে পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এআইয়ের বিশ্লেষণ সব সময় নির্ভুল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ছবির মান খারাপ হলে, তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে কিংবা কোনো ঘটনা প্রচলিত নিয়মের বাইরে হলে অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে, কোনো দাবিতে অস্বাভাবিক তথ্য পাওয়া গেলেই সেটিকে জালিয়াতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। প্রকৃত অনিয়ম ও বৈধ দাবির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে যথাযথ যাচাই এবং প্রয়োজনীয় মানবীয় তদারকি গুরুত্বপূর্ণ।

দুই দশকের তথ্যকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ

এইচডিএফসি এরগোর কাছে আন্ডাররাইটিং, দাবি নিষ্পত্তি ও গ্রাহক অভিজ্ঞতাসংক্রান্ত প্রায় দুই দশকের তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য শুধু সংরক্ষণ করাই এখন প্রধান বিষয় নয়; বরং সেগুলো থেকে কার্যকর বিশ্লেষণ ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী ধারণা বের করে আনাই বড় লক্ষ্য।

এ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি আন্ডাররাইটিং, গ্রাহকসেবা, দাবি ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণ কার্যক্রমের তথ্যের মধ্যে সংযোগ তৈরির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা গেলে ব্যবসার সামগ্রিক চিত্র বোঝা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ব্যাপকতা বোঝাতে নাগানাথন জানিয়েছেন, এইচডিএফসি এরগো প্রতি মিনিটে প্রায় ৩০টি গ্রাহক-যোগাযোগ পরিচালনা করে এবং একই সময়ে প্রায় ৮২টি বীমা পলিসি ইস্যু করে।

এত বিপুলসংখ্যক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এমন প্রযুক্তিব্যবস্থা প্রয়োজন, যা নিয়মিতভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে এবং কর্মীদের যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। এআই বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক শনাক্ত করা, গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত সামনে আনার মাধ্যমে এ কাজে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসে। বিশেষ করে প্রিমিয়াম নির্ধারণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতির সন্দেহ যাচাই এবং দাবি নিষ্পত্তির মতো বিষয়ে প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার সুযোগ থাকা জরুরি।

নাগানাথনের মতে, বীমা ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো আস্থা। তাই এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত গ্রাহকের আর্থিক স্বার্থকে প্রভাবিত করলে সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি উন্নয়ন

বুদ্ধিমান বীমাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ফলে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি এসেছে বলেই কোনো ব্যবস্থা আধুনিক করার পরিবর্তে এইচডিএফসি এরগো এমন বিনিয়োগে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ব্যবসায় সুস্পষ্ট সুফল আনতে পারে।

নাগানাথনের মতে, উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নকে পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে। নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার সময় বিদ্যমান অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও নিশ্চিত করা জরুরি।

গত ১৮ মাসে প্রতিষ্ঠানটি বাইরের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সফটওয়্যার কেনা এবং সফটওয়্যার-অ্যাজ-আ-সার্ভিস (সাস) পণ্যের ওপর প্রধানত নির্ভর করার পরিবর্তে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে অগ্রসর হয়েছে।

বীমা খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নিজস্ব তথ্যভান্ডার এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি তৈরি করছে। নিজস্ব প্রকৌশল সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এআই মডেলও তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা মৌলিক প্রযুক্তি ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।

এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি প্রযুক্তি বা সফটওয়্যার নিজস্বভাবে তৈরি করতে হবে। সাধারণ প্রয়োজনে বাজারে সহজলভ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যেসব ক্ষেত্রে নিজস্ব তথ্য, অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিতে পারে, সেখানে নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।

এই কৌশল প্রযুক্তিতে অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি কমানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ের তুলনায় প্রযুক্তিটি কতটা কার্যকর ফল দিচ্ছে, তার ওপর।

ছোট এআই মডেল ও স্বয়ংক্রিয় এজেন্টের ব্যবহার

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এআইয়ের পরবর্তী ধাপে সাধারণ কাজে ব্যবহৃত বড় মডেলের পাশাপাশি ছোট ও নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী ভাষাভিত্তিক মডেলের ব্যবহার বাড়তে পারে।

কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য ছোট মডেল ব্যবহার করলে ব্যয়, প্রক্রিয়াকরণের গতি এবং তথ্যের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রয়োজন বিবেচনায় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। তবে কোন মডেল উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করবে কাজের জটিলতা, তথ্যের মান এবং প্রয়োজনীয় নির্ভুলতার ওপর।

ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য নিয়ে কাজ করা বীমা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মডেল নির্বাচনের পাশাপাশি তথ্য কীভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এইচডিএফসি এরগো স্বল্পমূল্যের খুচরা স্বাস্থ্যবীমা ও মোটরবীমার দাবি নিষ্পত্তিতে এআই এজেন্ট ব্যবহারের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়েছে। এসব ব্যবস্থা নথি যাচাই, ছবির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত দাবি নিষ্পত্তির মতো কাজে সহায়তা করতে পারে।

প্রচলিত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সাধারণত আগে থেকে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে। অন্যদিকে, এআই এজেন্টকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে একাধিক সম্পর্কিত কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য তৈরি করা যায়। বীমা খাতে এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, নথি যাচাই ও প্রাথমিক মূল্যায়নের বিভিন্ন ধাপকে একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

এর সম্ভাব্য সুফলের মধ্যে রয়েছে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক কাজের চাপ কমানো এবং সন্দেহজনক দাবি শনাক্তকরণে দক্ষতা বৃদ্ধি। তবে এআই এজেন্টকে যত বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে, তার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনও তত বাড়বে।

কোন সিদ্ধান্ত এআই নিজে নিতে পারবে, কোন ক্ষেত্রে মানুষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দাবি অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য পাঠাতে হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা জরুরি। পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা এবং ভুল হলে দায় নির্ধারণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবায় নতুন সম্ভাবনা

ডিজিটাল বীমা ও বুদ্ধিমান বীমার মধ্যে পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারে নয়, বরং গ্রাহকের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার সক্ষমতায়ও।

প্রচলিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় সব গ্রাহককে নির্দিষ্ট সময়ে একই ধরনের পলিসি নবায়নের বার্তা পাঠানো হতে পারে। অন্যদিকে, বুদ্ধিমান ব্যবস্থা গ্রাহকের পছন্দ, পূর্ববর্তী যোগাযোগ এবং আচরণের ধরন বিবেচনা করে কখন ও কোন মাধ্যমে বার্তা পাঠানো বেশি উপযোগী হবে, তা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।

এতে নির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয়তার পরিবর্তে পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনাকারী সেবার সুযোগ তৈরি হয়।

গ্রাহকের জন্য এর অর্থ হতে পারে আরও প্রাসঙ্গিক বার্তা, পলিসির তথ্য সহজে পাওয়া এবং সহায়তা চাওয়া বা দাবি জমা দেওয়ার সময় অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমে যাওয়া। কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে গ্রাহকের আগের যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করেও সেবাকর্মীরা সমস্যাটি দ্রুত বুঝতে পারেন।

তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা দিতে গিয়ে গ্রাহকের তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। তথ্যের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভুল ধারণার ভিত্তিতে অনুপযুক্ত পরামর্শ বা বিভ্রান্তিকর যোগাযোগ এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

সব গ্রাহকের প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও এক রকম নয়। কেউ মোবাইল অ্যাপ ও স্বয়ংক্রিয় সহায়তা পছন্দ করতে পারেন, আবার কারও সরাসরি প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হতে পারে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী মানবিক সহায়তার সুযোগও বজায় রাখতে হবে।

দুর্ঘটনা বা হাসপাতালে ভর্তির মতো পরিস্থিতিতে গ্রাহকেরা দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি আশ্বাস, সহানুভূতি এবং নিজের পরিস্থিতি বোঝানোর সুযোগ চান। এআই কর্মীদের তথ্য সরবরাহ ও কাজের চাপ কমাতে পারে, কিন্তু মানুষের সহমর্মিতা ও পেশাগত বিচারবোধের গুরুত্ব কমায় না।

দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের দিকে ভারতের বীমা খাত

এইচডিএফসি এরগোর উদ্যোগ ভারতের বীমা খাতের বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন। ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে এখন বুদ্ধিমান প্রযুক্তি, বিশেষায়িত এআই মডেল, সমন্বিত গ্রাহক-তথ্যব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় কর্মপ্রবাহ যুক্ত হচ্ছে।

এর উদ্দেশ্য পুরো বীমা ব্যবসাকে মানুষের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা নয়। বরং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ কমানো, ঝুঁকি মূল্যায়ন উন্নত করা, দাবি নিষ্পত্তি সহজ করা এবং কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করাই প্রধান লক্ষ্য।

বীমা এমন একটি খাত, যেখানে সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা জড়িত। তাই এআই ব্যবহারের সাফল্য শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। গ্রাহকের আস্থা বজায় রাখা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, এআইয়ের সিদ্ধান্ত যথাযথ তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে এবং ভুল বা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি যেন প্রকৃত গ্রাহকদের জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

ভারতের বীমা খাতে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারবে, তারা সেবার মান ও পরিচালন দক্ষতা উন্নত করার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার সুযোগ পাবে।

ডিজিটাল বীমা থেকে বুদ্ধিমান বীমায় উত্তরণ তাই কেবল সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর পরিবর্তন নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়া, যেখানে তথ্য বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয়তার মাধ্যমে সেবা হবে আরও দ্রুত, সহজ ও গ্রাহককেন্দ্রিক—আর পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকবে আস্থা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।