খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই নভেম্বর ২০২৫, ১:৩৪ এএম
বাংলার গণিতচর্চার ইতিহাসে যে কজন মনীষী অমর হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম আলো ছড়ানো নাম—গণিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর অসামান্য প্রতিভা ও অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সম্মানিত করেছিল ‘গণিত সম্রাট’ উপাধিতে।
১৮৫৫ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভাবান শিশুর মধ্যে অল্প বয়স থেকেই গণিতের প্রতি তীব্র ঝোঁক দেখা যায়। পিতা কৃষ্ণ চন্দ্র চক্রবর্তী ও মাতা দুর্গা সুন্দরীর শিক্ষানুরাগী পরিবেশে বড় হয়ে যাদব চন্দ্র হয়ে ওঠেন এক অনন্য মেধার অধিকারী।
উচ্চশিক্ষায়ও তিনি ছিলেন অনবদ্য। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ ডিগ্রি অর্জনের পর শুরু হয় তাঁর শিক্ষকতা জীবন। প্রথমে কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা করতে করতেই তিনি পাটিগণিতের ওপর গবেষণা ও রচনায় গভীরভাবে নিমগ্ন হন।
এ সময়েই আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে আলীগড় কলেজে পাটিগণিতের অধ্যাপক হিসেবে যাদব চন্দ্রকে নিয়োগ দেন। তিনি যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন—সেজন্য স্যার সৈয়দ নিজে তাঁর জন্য আলাদা বাংলো ভাড়া করে দিয়েছিলেন। শিক্ষাবিদদের প্রতি এমন সম্মান আদর্শ হয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে।
১৮৯০ সালে প্রকাশিত তাঁর ইংরেজি পাটিগণিত বই গণিতশিক্ষার জগতে বিপ্লব ঘটায়। অল্প সময়ের মধ্যেই বইটি বাংলা, উর্দু, হিন্দি, অসমিয়া, নেপালি, মায়াবীসহ নানা ভাষায় অনূদিত হয়ে উপমহাদেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এরপর ১৯১২ সালে প্রকাশিত বীজগণিত গ্রন্থও এনে দেয় সমান খ্যাতি ও সমাদর।
১৯১৬ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে তিনি ফিরে আসেন প্রিয় সিরাজগঞ্জে—শেকড়ের টানে, আপন মানুষের কাছে। ইতোপূর্বেই ১৯০১ সালে তিনি শহরের ধানবান্ধি এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। অবসরজীবনে সেই ঘরই হয়ে ওঠে তাঁর নীরব সাধনার স্থান। গ্রামের বাড়ি তেঁতুলিয়ায় তিনি নির্মাণ করেন একটি মন্দির—যা আজও তাঁর স্মৃতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯২০ সালের ২৬ নভেম্বর, কলকাতার নিজ বাসভবনে পর্দা নামে এই খ্যাতিমান পণ্ডিতের জীবনযাত্রার। ৬৫ বছরের জীবনে তিনি রেখে গেছেন শিক্ষা, গবেষণা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
গণিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তীর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বাংলার গণিতচর্চা তাঁকে চিরকাল প্রণাম জানাবে।
মন্তব্য