দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের আলামত নষ্ট ও আড়াল করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছে হামাস। সংগঠনটির দাবি, গাজার বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ সরানো, ভেঙে ফেলা এবং এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরের মাধ্যমে যুদ্ধকালীন ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মুছে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে হামাস এ অভিযোগ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, গাজার বিভিন্ন স্থানে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের অনেকের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বস্তুগত আলামতও এসব ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রয়েছে।
হামাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপ অপসারণের আগে ঘটনাস্থল যথাযথভাবে সংরক্ষণ, মরদেহ শনাক্তকরণ এবং সম্ভাব্য আলামত সংগ্রহ না করা হলে ভবিষ্যতে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সংগঠনটি মনে করে, যুদ্ধের সময় কী ঘটেছিল তা নির্ধারণের জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, মাটির নিচে থাকা মরদেহ এবং অন্যান্য বস্তুগত প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিবৃতিতে হামাস আরও দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট স্থান, মরদেহ ও আলামতে হস্তক্ষেপ করা আন্তর্জাতিক আইনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নির্দেশনারও পরিপন্থী। গাজায় গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে চলমান মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত প্রমাণ সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
হামাসের অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এই বিবৃতির তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের উদ্দেশ্য বা এ প্রক্রিয়ায় আলামত নষ্ট হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে হামাসের দাবিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গাজার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অন্যতম বড় মানবিক সমস্যা হয়ে উঠেছে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও অবকাঠামোর কারণে উদ্ধারকাজ যেমন কঠিন, তেমনি ধ্বংসস্তূপের ভেতরে থাকা মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা এখনো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে হামাস জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি গাজার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাস্থলগুলো দ্রুত সুরক্ষিত করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, শনাক্তকরণ, নথিভুক্তকরণ ও সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক তদন্তকারী দল এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
হামাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার ধ্বংসস্তূপ দ্রুত সরানো এবং পুনর্নির্মাণ শুরু করা মানুষের জন্য জরুরি মানবিক প্রয়োজন। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্গঠন ছাড়া স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা কঠিন। তবে পুনর্নির্মাণের আগে যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাস্থল ও সম্ভাব্য আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে নিখোঁজদের মরদেহ উদ্ধার করে পরিচয় শনাক্ত করা এবং যথাযথভাবে দাফনের সুযোগ নিশ্চিত করাকে পরিবারের অধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে হামাস। তাদের মতে, মরদেহ ও ঘটনাস্থলের আলামত সংরক্ষণ শুধু বিচারিক তদন্তের জন্য নয়, নিহতদের মর্যাদা এবং স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
গাজায় যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিপুল ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একদিকে দ্রুত উদ্ধার ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে যুদ্ধকালীন ঘটনার সম্ভাব্য প্রমাণ সংরক্ষণের প্রশ্নও সামনে এসেছে। এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


