গাজীপুর জেলার পৃথক চার স্থান থেকে এক শিশু ও এক কিশোরসহ মোট চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর এবং মৌচাক এলাকা থেকে এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চার ঘটনার মধ্যে রয়েছে জমি ও ঘাস কাটা সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধের জেরে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, নদ থেকে নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার, জঙ্গলে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির অর্ধগলিত ঝুলন্ত দেহ প্রাপ্তি এবং ট্রেনে কাটা পড়ে বাকপ্রতিবন্ধী এক যুবকের করুণ মৃত্যু। একদিনে পর পর এসব মর্মান্তিক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে চরম শোক ও চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
কাপাসিয়ায় ঘাস কাটা নিয়ে বিরোধে যুবককে কুপিয়ে হত্যা
কাপাসিয়া উপজেলার পাবুর দক্ষিণ পাড়া এলাকায় গরুর জন্য ঘাস কাটাকে কেন্দ্র করে স্বজনদের মধ্যকার কলহ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত নিলয় সরকার (২০) পাবুর এলাকার মনির সরকারের ছেলে। শনিবার সকালে চাচাতো ভাই রাসেলের সাথে নিলয়ের ঘাস কাটা নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। ঘটনার জের ধরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিলয়ের ওপর ওঁৎ পেতে হামলা চালায় রাসেল। আব্দুর রশিদ এতিমখানার পাশের পাকা রাস্তায় আসামাত্রই রাসেলের হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিলয়ের মাথায় অতর্কিত কোপ দেওয়া হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় স্থানীয়রা নিলয়কে উদ্ধার করে দ্রুত গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত রাসেল পলাতক রয়েছে। কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমেদ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অভিযুক্ত রাসেলকে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম অভিযানে নেমেছে। এই ঘটনায় একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
তিন দিন পর ব্রহ্মপুত্র নদে ভেসে উঠল নিখোঁজ শিশুর লাশ
একই উপজেলার ঘাগটিয়া ইউনিয়নের খিরাটি গ্রামে ঘটেছে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। নিখোঁজের তিন দিন পর ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে জাহিদ হাসান নামে পাঁচ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃত জাহিদ খিরাটি গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমানের ছেলে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২৭ আগস্ট দুপুর থেকে শিশু জাহিদকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো হদিস না পেয়ে স্বজনরা কাপাসিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ঘটনার তিন দিন পর শনিবার সকাল ৮টার দিকে শিশুটির নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে ব্রহ্মপুত্র নদের ঘাটে স্থানীয়রা একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন। পরে কাপাসিয়া থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ নদী থেকে লাশটি উদ্ধার করে। শিশুটির এই অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুতে গোটা গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কালিয়াকৈরে জঙ্গল থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গলাচিপা এলাকার একটি গহীন জঙ্গল থেকে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির ঝুলন্ত ও অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জঙ্গলের ভেতরে গাছের সাথে মরদেহটি ঝুলতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে থানায় খবর দেন।
খবর পেয়ে কালিয়াকৈর থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত সেখানে পৌঁছায় এবং গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় গাছে ঝুলতে থাকা মরদেহটি নিচে নামিয়ে আনে। মরদেহটিতে পচন ধরে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের নাম বা পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশ নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করতে আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে মরদেহটি শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি আত্মহত্যা, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মৌচাকে ট্রেনে কাটা পড়ে বাকপ্রতিবন্ধী যুবকের মৃত্যু
এদিকে জয়দেবপুর-ঢাকা রেলসড়কের মৌচাক স্টেশন এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে আবু বকর (২৫) নামে এক বাকপ্রতিবন্ধী যুবকের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকাল ১০টার দিকে মৌচাক প্ল্যাটফর্মের অদূরে রেললাইন পার হওয়ার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফারুক আহমেদ জানান, নিহত আবু বকর বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় হয়তো ট্রেন আসার শব্দ শুনতে পাননি। চালক সিটি বাজালেও তিনি লাইন থেকে সরে যেতে পারেননি, ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহতের বাড়ি রেল স্টেশন এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় এবং পরিবারের কোনো আপত্তি না থাকায় স্বজনরা তার মরদেহ উদ্ধার করে নিজ বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
একই দিনে গাজীপুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর পর চারজনের এমন প্রাণহানির ঘটনায় পুরো জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ জানায়, প্রতিটি পৃথক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়া প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।



