গাজীপুরে দুই শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগে তিন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পৃথক দুটি মামলায় গত শুক্রবার রাতে একজন এবং শনিবার আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নির্যাতনের শিকার দুই শিক্ষার্থীর বয়স ১২ ও ১৩ বছর।
ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার সাক্রাউরী এলাকার ‘আল-মাদ্রাসাতু দারুদ তাকওয়া’ মাদ্রাসায়। গত বুধবার বিকেলে মাদ্রাসার মাঠে খেলার সময় দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে ঝগড়াকে কেন্দ্র করে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।
গ্রেপ্তার তিন শিক্ষক হলেন শোয়াইব আহাম্মদ (২৬), মো. হাবিবুর রহমান (২৬) ও মো. শাহিন (১৯)। শোয়াইব ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার চর মুহুরী এলাকার বাসিন্দা। হাবিবুর রহমানের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বরমা গ্রামে। আর শাহিন শেরপুরের শ্রীবর্দী উপজেলার ভাইডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থীর একজনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলী এবং অন্যজনের বাড়ি শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায়।
পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে মাদ্রাসার মাঠে খেলতে গিয়ে এক শিক্ষার্থীর পায়জামা খুলে যায়। এ নিয়ে তার সঙ্গে আরেক শিক্ষার্থীর ঝগড়া হয়। বিষয়টি শিক্ষক শোয়াইব আহাম্মদের নজরে এলে তিনি এক শিক্ষার্থীকে কঞ্চি দিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। পরে গরম লোহার খুন্তি দিয়ে তার নিতম্বে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি কাউকে জানালে পরিণতি ভালো হবে না বলে ওই শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানো হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ।
অন্য শিক্ষার্থীকে একটি কক্ষে আটকে রেখে হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করা হয় বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। তাকে বিবস্ত্র করে মারধরের পাশাপাশি গরম খুন্তি দিয়ে তলপেটে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। পরে শোয়াইবের সঙ্গে হাবিবুর রহমান ও শাহিনও ওই শিক্ষার্থীকে নির্যাতনে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তার বাবা।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বৃহস্পতিবার রাতে বাড়িতে ফিরলে তাঁর বাবা ছেলের হাঁটা ও বসার অস্বাভাবিকতা দেখতে পান। জিজ্ঞাসা করলে ভয়ে সে প্রথমে শরীরে ফোড়া হয়েছে বলে জানায়। পরদিন আবার জানতে চাইলে কান্নার মধ্যে পুরো ঘটনা পরিবারের কাছে প্রকাশ করে।
এরপর শুক্রবার ওই শিক্ষার্থীর বাবা ছেলেকে নিয়ে মাদ্রাসায় যান এবং শিক্ষকের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি। বরং তাঁকে দুর্ব্যবহার করে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়ার পাশাপাশি হুমকি দেওয়া হয়। পরে তিনি ছেলেকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান।
বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। শুক্রবার রাতে সাক্রাউরীর মুন্সি মার্কেট এলাকা থেকে শিক্ষক শোয়াইব আহাম্মদকে স্থানীয় লোকজন আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে গাছা থানায় মামলা করেন।
শুক্রবার রাতে প্রথম মামলা হওয়ার পর অন্য শিক্ষার্থীর পরিবারও বিষয়টি জানতে পারে। শনিবার ওই শিক্ষার্থীর বাবা পৃথক আরেকটি মামলা করেন। দ্বিতীয় মামলায় শোয়াইব আহাম্মদের পাশাপাশি মাদ্রাসার আরও দুই শিক্ষক হাবিবুর রহমান ও শাহিনকে আসামি করা হয়। এরপর পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী জানান, মাদ্রাসার দুই শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে এবং তিন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের এই অভিযোগ ঘিরে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাসনের নামে মারধর, ভয় দেখানো বা শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে মামলার অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। পুলিশ জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


