গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

তীব্র গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলের গ্যাসনির্ভর কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও উৎপাদন আংশিক কমিয়ে চালানো হচ্ছে, আবার কোথাও কয়েক দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কারখানার কার্যক্রম। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে জনবল কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

আশুলিয়ার কাঠগড়া আমতলা এলাকায় ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এ আর ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেডে কয়েক সপ্তাহ ধরে কম সক্ষমতায় উৎপাদন চলছিল। তবে বুধবার রাত পর্যন্ত সীমিতভাবে কার্যক্রম চালানোর পর গতকাল সকালে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে যায় যে কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়। সরেজমিনে কারখানাটির তিনটি বিভাগই বন্ধ দেখা যায়। শ্রমিকদের উপস্থিতি ছিল না; নিরাপত্তারক্ষী ও কয়েকজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছিলেন।

কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকট শুরুর পর উৎপাদন সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ হাজার পিস। কিন্তু বাইরে থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এরপরও কারখানার একটি অংশ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

ড্রাই প্রসেস, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কোয়ালিটি বিভাগে থাকা প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি যন্ত্রের মধ্যে ২৪টি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কারখানাটির উৎপাদনের জন্য যেখানে প্রায় ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেখানে চাপ শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ পিএসআইয়ের মধ্যে ওঠানামা করছে। কর্মকর্তাদের দাবি, চাপ সাময়িকভাবে ২ দশমিক ৫ পিএসআই পর্যন্ত উঠলেও গ্যাসের মান প্রত্যাশিত না হওয়ায় অনেক সময় তা উৎপাদনে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের কোম্পানি সচিব আরএকে লিটন বলেন, ওয়াশিং প্ল্যান্টে উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সংকট সামাল দিতে বাইরে থেকে গ্যাস এনে সিএনজি স্টেশনের আদলে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। এতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের প্রায় অর্ধেক সময় গ্যাসের চাপ শূন্য থাকে।

আশুলিয়ার আরও কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিজা গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের একটি বস্ত্র কারখানা টানা ১৫ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকা করে লোকসান হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তারক্ষীরাও জানান, সেখানে বর্তমানে কোনো শ্রমিক কাজ করছেন না। বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকজন শ্রমিক কারখানার ফটকে এলেও তাঁদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের পরিস্থিতিও সংকটজনক। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ পিয়াল জানান, কাগজে-কলমে রং করার কারখানাটি চালু থাকলেও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বাস্তবে উৎপাদন প্রায় বন্ধ। কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

গ্যাসের চাপ সামান্য বাড়লেই কারখানার সব যন্ত্র চালু করা হয়। কিন্তু যন্ত্রগুলো প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় পৌঁছানোর আগেই চাপ আবার কমে যায়। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রতিটি উৎপাদন ব্যাচে থাকা বিপুল পরিমাণ পণ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। অনিরুদ্ধ পিয়ালের দাবি, এতে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।

কারখানাটিতে প্রায় ৯৭৫ জন শ্রমিক কর্মরত। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন পরিশোধের দায় থেকে প্রতিষ্ঠানটি মুক্ত নয়। ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি, কারখানার স্থায়ী ব্যয় এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহনের চাপও বাড়ছে।

গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের চেষ্টা করছে জামগড়ার লিটল স্টার স্পিনিং মিল। কিন্তু তাতেও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, একাধিক জ্বালানি উৎস ব্যবহার করেও মিলটি সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস দিয়ে বর্তমানে কার্যত কোনো উৎপাদন হচ্ছে না। বিদ্যুতের মাধ্যমে প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপাদন চালানো হচ্ছে এবং বাকি অংশ কিছুটা সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির সাহায্যে পূরণ করা হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ টাকা খরচ হচ্ছে।

মিলটিতে গ্যাসের চাপ সর্বোচ্চ ১ থেকে ১ দশমিক ৫ পিএসআই পর্যন্ত উঠছে, যা প্রয়োজনীয় যন্ত্র ও জেনারেটর চালানোর জন্যও যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ধরে রাখতে তিন শিফটে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ছয়টি বিভাগের মধ্যে মাত্র দুটি চালু রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের প্রয়োজনেই কখনো কখনো লোকসানে সুতা বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।

খোরশেদ আলম বলেন, গ্যাসের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে অন্তত ৩০ শতাংশ জনবল কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ নাও থাকতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তবে আশুলিয়া অঞ্চলে কারখানা বন্ধের সংখ্যা নিয়ে শিল্প পুলিশের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। শিল্প পুলিশ-১-এর সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, গ্যাস সংকটের কারণে আশুলিয়া অঞ্চলের কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁদের কাছে বড় ধরনের কোনো তথ্য নেই।

তিনি বলেন, মুন্নু সিরামিকস এক থেকে দুই দিন বন্ধ ছিল। একই সময়ে প্রীতি অ্যাপারেলসসহ আরও একটি কারখানা সমস্যায় পড়েছিল। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হলে এসব কারখানায় উৎপাদনও স্বাভাবিক হয়ে আসে বলে তিনি জানান।

আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপের এই অস্থিরতা তাই শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয় নয়। কারখানাগুলোকে একদিকে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হলেও শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য স্থায়ী খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে রং, ধোয়া, সুতা ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় গ্যাসের চাপের সামান্য ওঠানামাও পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাকে থামিয়ে দিতে পারে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানি আদেশ পূরণে জটিলতা এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও। ফলে গ্যাস সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক উৎপাদন সংকট নয়, বরং কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানার ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।

Tags :

ratul Khaborwala

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর