মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: ২৫ই মার্চ ২০২৫, ৯:৯ পিএম
খুব দ্রুততার সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে আমাদের জীবন, চিরচেনা জগৎ। চিরপরিচিত আড্ডা, কোলাহল সব কিছু। বাবা-মা, ভাইবোন নিয়ে ছোট্র এখনকার পরিবারগুলো। সবাই একসঙ্গে আছে কিন্তু কারও সঙ্গে কোন কথা নেই, গল্প নেই, চোখে চোখ রেখে কোন ভাব বিনিময় নেই। সবাই ব্যস্ত কেবলই একটি মাধ্যম নিয়ে। আর যোগাযোগ করছে ঘরের চারদেয়ালের বাইরের মানুষগুলোর সাথে। আগে কল্পনাও করা যেতো না এত সহজে এত মানুষের সঙ্গে পরিচয়, যোগাযোগ, এত আলোচনা-সমালোচনা, এত কথোপকথন। বিশ্বায়নের এই যুগে সোশ্যাল মিডিয়া যেন আমাদের চিন্তাচেতনা দৈনন্দিন জীবনধারাকে খুব দ্রুত পাল্টে দিয়েছে। অনেক বছর আগে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া বন্ধু স্বজনরা আবার এসে হৃদয়তন্ত্রিতে জোড়া লাগছে। পৃথিবীর কত দেশের কত মানুষ, তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত ভিন্ন ভিন্ন পথ সব যেন এক স্রোতে এসে মিশে গেছে।
কে নেই এখানে? ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে একসঙ্গে একযোগে পাওয়া, সুখের খবর অথবা দুঃখের খবর শেয়ার করা, অন্যদের প্রতিক্রিয়া জানা এত সহজ হয়েছে শুধু এই মাধ্যমের কল্যাণে। বর্তমানের যে কর্মব্যস্ত জীবন তার ভিতর আকাশের মত সোশ্যাল মিডিয়ার দিগন্তজোড়া কর্মযজ্ঞ আমাদের সুখের মন্ত্রণা দেয়, আমাদের সামাজিক করে গড়ে তোলে।
অবাক হই চেনা অচেনা মানুষগুলোর অসাধারণ লেখনী সক্ষমতা দেখে, হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে থাকা কথামালার সাহসী উচ্চারণ দেখে। দূরদূরান্ত থেকে শত সহস্র বিষয় নিয়ে পরিপূর্ণ আবেগ সহযোগে কি বৈচিত্র্যময় সব প্রতিক্রিয়া। পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে শান্ত স্নিগ্ধ সরল ঘরানার মেয়েটির মনে কত ঘৃণা পাহাড় হয়ে জমে ছিল, সেও বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে তার বিক্ষুব্ধতার। কিংবা কেউ কি ভেবেছে চিরচেনা সেই ভালো ছেলেটার মনে নারীর প্রতি এত বিদ্বেষ, এত ক্ষোভের কথা? সুযোগতো হচ্ছে অনেককে চেনার। একে অপরের সুখ-দুঃখে অংশ নিয়ে সমব্যথী হওয়া, সাহস জোগানো কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে জোড়ালো প্রতিবাদ আগে কি কেউ এভাবে ভাবতে পেরেছে? কারও সম্বন্ধে জানতে তার প্রোফাইলে গিয়ে ছবি দেখা, ব্যক্তিত্বকে পরখ করে দেখার জন্য তার বিভিন্ন পোস্ট কিংবা স্ট্যাটাস দেখা, মনোভাব বোঝার জন্য কমেন্টস, সার্বিক অবস্থা, পড়াশোনা এবং কর্মদক্ষতা বোঝার জন্য পুরো প্রোফাইল এবং লিঙ্ক খুঁজে দেখা এসবই এখন কত সহজলভ্য!
পৃথিবীর কোথাও কোনো অন্যায়, অবিচার, অসামঞ্জস্য দেখামাত্র সঙ্গে সঙ্গে ছবি পোস্ট ও ভিডিওতে লাইভ দেখানো, স্ট্যাটাস শেয়ার করে পৃথিবীব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বিগত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে এই সোশ্যাল মিডিয়া।
এখানে সবাই পাচ্ছে মতপ্রকাশের অবাধ অধিকার। নিজেকে তুচ্ছ ব্যক্তি ভেবে যে মনোবেদনা ছিল, মত প্রকাশের যে অন্তরায় ছিল বর্তমানে তা বিলুপ্ত প্রায়। অপরদিকে পৃথিবীর বড় বড় মানুষের সংস্পর্শে এসে তাদের ব্যক্তি জীবন, কর্মজীবন, মনোভাব, তাদের আচার-আচরণ, চিন্তাধারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যক্তিকেও প্রভাবিত করছে। জীবন সম্বন্ধে নতুন করে ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। মানুষের হৃদয়, তাদের চেতনাবোধ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করছে। নতুন এই সংযোজনে সুযোগ এসেছে অন্যকে জানার আর নিজেকে জানানোর। বিশেষ করে যারা জীবন ও জীবিকার তাগিদে দূর দেশে অবস্থান করছে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে, তাদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া যেন একরাশ আনন্দসহ আশীর্বাদ বয়ে এনেছে।
অবাধ তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রেও সোশ্যাল মিডিয়া ঘটিয়েছে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। প্রচার ও প্রচারণার প্রয়োজনে রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকা, টেলিফোনের গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে। কারণ সবাই ব্যস্ত এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে। যে কোনো খবর নিমিষেই পৌঁছে যাচ্ছে সবার কাছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানবিক বিষয়সহ শিক্ষা, চিকিৎসা, শারীরিক সুস্থতা এমন কি মহিলাদের রান্না, বর্তমান ফ্যাশন এবং রূপ-লাবণ্য চর্চার যাবতীয় উপাদান পাওয়া যায় এখানে।
তবে এতসব ইতিবাচক কথা বলার পরও অনেক নেতিবাচক দিক নিয়েও কিন্তু ভাবনার যথেষ্ট কারণ আছে। এই মাধ্যমটা হাতের মুঠোয় পেয়ে অনেকে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। ভেঙে যাচ্ছে চিরচেনা পরিবার, আমাদের চিরায়ত গৌরবময় সামাজিক কাঠামো। কখনো সখনো ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছে আমাদের আদরের কিশোরী কন্যা অথবা কারও যুবতী জায়া। ফেসবুকের অন্য কোনো যুবকের ফেইক প্রোফাইলের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার খবর এখনো প্রতিনিয়ত শোনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে যাচ্ছে ঘর, কারও কারও সাজানো সংসার। মিথ্যুক-ভন্ডদের প্রতারণার ছলে পড়ে অভিশপ্ত হয়ে অকালে ঝরে পড়ছে ফুলের মতো নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক অনেকের জীবন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিহিংসাপ্রবণ হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতেও এই মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে যাচ্ছেতাই ভাবে। বিশেষ করে সুন্দরী, তরুণী এবং যুবতী নারীদের ছবি এডিট করে এ যুগের ব্যর্থ রোমিওরা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো পৃথিবীতে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু মেয়েটির সরলতার সুযোগে তাকে প্রতারিত করে গোপন ক্যামেরায় ছবি তুলে জনসম্মুখে তাকে বিবসনা করে উপস্থাপন করে, মেয়েটির সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারটিকেই এক অপ্রীতিকর কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখে ফেলে দিচ্ছে। বাদ যাচ্ছেনা ছেলেরাও। তার উপর এআই প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা বোঝাটাই এখন বড় দায়!
আমাদের কিছু অসৎ চক্র আবার গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে হীন ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে অন্যের সম্ভ্রমহানির চেষ্টায় সক্রিয় আছে, বাড়ছে সাইবার ক্রাইম। বর্তমানে ফেসবুক আসক্তি নিয়ে একটি আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে চারদিকে। আমাদের মধ্যে অনেকেই কর্মোদ্যম দিনের একটা বড় অংশ এই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করছি। ছাত্ররা পড়াশোনা বাদ দিয়ে, চাকরিজীবীরা জীবিকা বাদ দিয়ে, গৃহবধূরা গৃহকর্ম বাদ দিয়ে এই মাধ্যমে ব্যস্ত সময় পার করছে। তার মানে আমরা আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একটা অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে অপচয় করছি। অনেকে আবার কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়ে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার কথা চিন্তা করে ছবি তুলছে। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা সে উপভোগ করছে না, একই সঙ্গে উপস্থিত অন্যরাও তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে সামাজিক বন্ধন। অনেকে আবার পরিবার-পরিজন ভুলে সারাক্ষণ সময় কাটাচ্ছে এই সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফলে দিন দিন বেড়েই চলেছে এই মাধ্যমে এডিক্টেডদের সংখ্যা। এটা সবাইকে এত বেশি নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছে যে, অনেক সময় নাওয়া-খাওয়া, দায়দায়িত্ব সব কিছু বাদ দিয়ে সব সময় ফেসবুককেন্দ্রিক জীবন হয়ে উঠেছে। ফলশ্রুতিতে পারিবারিক পরিমণ্ডলে বাড়ছে আস্থা এবং বিশ্বাসের সংকট।
তাইতো প্রশ্ন হলো, সোশ্যাল মিডিয়া কি আমাদের পরিবার থেকে, সমাজ থেকে বিচ্যুত করে ফেলছে, নাকি সামাজিক করে গড়ে তুলতে বিশেষ অবদান রাখছে? ফেসবুক কি আলোর দুয়ার খুলছে নাকি সমাজকে অন্ধকার পথে টেনে নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতার পথও তৈরি করে দিচ্ছে।
প্রতিটা নতুন আবিষ্কার প্রথম যখন জনমানুষের সম্মুখে আসে তখন ইতিবাচক দিকগুলোর সঙ্গে সঙ্গে নেতিবাচক রূপগুলোও প্রকাশ পায়। কিন্তু দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমরা আশাবাদী প্রাণী হিসেবে ইতিবাচক দিকটাই যেন গ্রহণ করি। কেননা ডিজিটাইজেশনের এই যুগে পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও প্রতিনিয়ত প্রসারিত হওয়ার কথা। এই সোশ্যাল মিডিয়া ক্ষুদ্র গণ্ডি ভেদ করে মানুষের সামনে খুলে দিচ্ছে পুরো পৃথিবীর অবারিত দ্বার। কমে আসছে দূরত্ব, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। দেশ, জাতি, সংস্কৃতি সব সীমানা পেরিয়ে সবাই যুক্ত হচ্ছে একসঙ্গে। এই অবারিত সুযোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ না করার ধৃষ্টতা দেখালে শেষতক পিছিয়ে পড়বো আমরাই, আর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আমাদের মনুষ্যত্ববোধ।
মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
গবেষক, সমাজ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
খবরওয়ালা/এসআর
মন্তব্য