চাঁদার দাবি মেনে না নেওয়ায় একের পর এক তাণ্ডব, রক্তপাত এবং প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে। সাম্প্রতিক সময়ে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার স্থানেও অব্যাহত চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে। টাকা না দিলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি, বাড়িঘেরে হামলা, কুপিয়ে জখম কিংবা সরাসরি গুলি করে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে অহরহ। ফলে সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি স্পষ্ট রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশীনগর এলাকায় মাছ ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেনকে দিনে-দুপুরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তার ওপর এই আক্রমণ চালায় একদল অস্ত্রধারী। এর মাত্র দুদিন আগে রাজধানীর বাড্ডায় ময়নারবাগ এলাকায় মো. রানা নামের এক যুবককে ঘরে ঢুকে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা; সেখানেও মূল বিরোধের কারণ ছিল চাঁদা। অন্যদিকে চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবীরাও বাদ যাচ্ছেন না এই তাণ্ডব থেকে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চিকিৎসক এম ওয়াই এফ পারভেজের সিরিয়াল লাইনে ব্যবহৃত ফোনে কল দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে চেম্বারে ঢুকে গুলিবর্ষণের হুমকি দেওয়ায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে বাধ্য হয়েছেন।
রাজনীতি ও সামাজিক প্রতিবাদ জানিয়েও কোনো নিস্তার মিলছে না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মান্নান হোসেন শাহীন সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়ায় তার ওপর পর পর কয়েকবার সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর উল্টো তাকেই নানাভাবে হয়রানি ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার পাশাপাশি পরিবারসহ মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র আসামি গ্রেপ্তার করে এই সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজি বন্ধ করা অসম্ভব। পুলিশ সাময়িকভাবে কাউকে গ্রেপ্তার করলেও দুর্বল তদন্ত, প্রসিকিউশনের অপেশাদারত্ব এবং আইনের ফাঁকফোকর গলে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের মতে, নগরে ভাসমান ও বেকার তরুণ-কিশোরদের ব্যবহার করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট তাদের চাঁদাবাজির রাজত্ব বজায় রাখছে। কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, আসামিদের সঠিক পুনর্বাসন, অপরাধ চক্রের পেছনে থাকা রাজনৈতিক মদদ বন্ধ এবং শক্তিশালী বিচার কাঠামো প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত নাগরিক জীবনের এই নিরাপত্তাহীনতা দূর করা যাবে না।


