দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চার মাসের বেশি সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৯৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০-এর মাইলফলক ছুঁতে আর মাত্র তিনটি মৃত্যু বাকি।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮ শিশু। তাদের মধ্যে ১৩০ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে দুজন সিলেট বিভাগের, একজন রাজশাহী বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের। এ নিয়ে চলমান হাম পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৬ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৭০৮ শিশু। বিপুলসংখ্যক শিশুর মধ্যে হাম শনাক্ত না হলেও হামের মতো উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যাও এক লাখ ছাড়িয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ২ হাজার ২৪৪ শিশু এসব উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৮ হাজার ৪১১ শিশু। অর্থাৎ, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে কিংবা জটিলতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মৃত্যুর ধারাবাহিক বৃদ্ধির চিত্রটি সাম্প্রতিক সময়ের পরিস্থিতির তীব্রতা আরও স্পষ্ট করে। গত ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে মোট ৭০২ জনে পৌঁছেছিল। এর মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭-এ দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এই সময়ে আরও ৯৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে হাম পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেওয়ার মতো উপসর্গ দিয়ে রোগটি প্রকাশ পায়। শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কিংবা সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার মতো জটিলতা দেখা দিলে আক্রান্ত শিশুর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম প্রতিরোধে টিকাদান, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জ্বর ও হামের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত চার মাসের বেশি সময়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা দেশের শিশুস্বাস্থ্যের ওপর হাম পরিস্থিতির বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০-এর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।