আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ব্যাংকের চেক চুরি করে তা জালিয়াতির মাধ্যমে ৩৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে লক্ষ্মীপুরের এক সাবেক শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। রোববার বিকেলে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রেজাউল হক আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এই আদেশ দেন। আদালতের জারিকারক মো. মাসুদ রোববার সন্ধ্যায় সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
কারাগারে পাঠানো ওই আইনজীবীর নাম হুমায়ুন কবির হাওলাদার। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নের মহাদেবপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা। পেশাগতভাবে তিনি একজন সিনিয়র আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও এমন আর্থিক অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় আইনি ও সুশীল সমাজে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার নথিপত্র ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, নালিশি এই মামলাটির বাদী রায়পুর উপজেলার উদমারা গ্রামের বাসিন্দা ইউছুফ আলী। তাঁর স্ত্রী মরিয়ম বেগম অভিযুক্ত আইনজীবী হুমায়ুন কবিরের নিকটাত্মীয়। কিছুদিন আগে মরিয়ম বেগমের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যান হুমায়ুন। সেখানে অবস্থানকালে অত্যন্ত কৌশল অবলম্বন করে সাউথইস্ট ব্যাংকের হায়দরগঞ্জ শাখার একটি চেক চুরি করেন তিনি। এরপর চুরিকৃত চেকে ছত্রিশ লাখ একাশি হাজার টাকার অঙ্ক বসিয়ে মরিয়মের স্বাক্ষর হুবহু নকল বা জাল করে টাকা তোলার জন্য ব্যাংকে জমা প্রদান করেন। তবে চেকে দেওয়া স্বাক্ষরের সাথে হিসাবধারীর মূল স্বাক্ষরের ব্যাপক গরমিল দেখা দিলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সতর্ক হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি মরিয়মকে অবহিত করে।
বিষয়টি জানতে পেরে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে মরিয়মের স্বামী ইউছুফ আলী বাদী হয়ে রায়পুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন। মামলায় হুমায়ুন কবির হাওলাদারসহ আব্দুস শহীদ নামে আরও এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। আদালত অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এর নিরপেক্ষ তদন্তের দায়িত্ব দেন সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল)-কে।
তদন্ত চলাকালে চেকের স্বাক্ষরের সত্যতা নিশ্চিত করতে নথিপত্র পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হস্তলিপি বিশারদের কাছে পাঠানো হয়। বৈজ্ঞানিক ও বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার পর চেকের স্বাক্ষর যে পুরোপুরি জাল ছিল, তার সুনির্দিষ্ট সত্যতা প্রমাণ হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও সিআইডির রিপোর্ট পর্যালোচনা শেষে সহকারী পুলিশ সুপার আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গত ৭ অক্টোবর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
বাদীর পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ফিরোজ আলম জানান, আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর রোববার আইনজীবী হুমায়ুন কবির আদালতে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জামিন প্রার্থনা করেন। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই মামলার দ্বিতীয় আসামি আব্দুস শহীদ বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং পুলিশ তাঁকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নেতার আইনি জটিলতা নিয়ে সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, সংগঠনের প্রধান হিসেবে আদালত আমাকে উভয় পক্ষের মধ্যে বিষয়টি আপস-সংমঝোতার একটি দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমরা আদালতের কাছে প্র প্রয়োজনীয় আলোচনার জন্য সাত দিনের সময় আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ভুক্তভোগী বাদীপক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ায় অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত সমঝোতার প্রচেষ্টা সফল হয়নি।


