ছয় সপ্তাহে বীমা কোম্পানির গোপন সার্ভার বন্ধের নির্দেশ

দেশের সব বীমা কোম্পানিকে আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে গোপন ও অতিরিক্ত সার্ভার বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার নির্দেশ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। বীমা খাতে তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো, প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি আরও কার্যকর করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিনভিন কুমিল্লায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে বীমা রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত এক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ নির্দেশনার কথা জানান।

তিনি বলেন, দেশের কিছু বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তাদের প্রকৃত আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সার্ভার ব্যবহার করে ব্যবসা, প্রিমিয়াম আয় ও অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য আলাদা করে রাখার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব আর্থিক অবস্থা এবং নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে কোম্পানিটির প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিভিন্ন সার্ভারে তথ্য ছড়িয়ে থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক চিত্র একসঙ্গে পাওয়া যায় না। এতে তদারকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ—দুই ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হয়।

মীর নাদিয়া নিনভিন স্পষ্ট করে বলেন, ছয় সপ্তাহের মধ্যে সব গোপন ও অতিরিক্ত সার্ভার বন্ধ করে কোম্পানির তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো কোম্পানি গোপনে, এমনকি গ্যারেজ, বিছানার নিচে বা অন্য কোনো স্থানে সার্ভার লুকিয়ে রাখলেও প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির প্রস্তুতি

বীমা খাতের তদারকি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বর্তমানে কোনো বীমা কোম্পানির আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন দিয়ে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান আর্থিক ঝুঁকি সব সময় বোঝা সম্ভব নয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকায় ততদিনে কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, তথ্যের সামঞ্জস্য এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর ফলে আর্থিকভাবে দুর্বল কোনো প্রতিষ্ঠান বড় সংকটে পড়ার আগেই ঝুঁকির সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

প্রতিটি পলিসিতে স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর

তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়াতে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে প্রতিটি বীমা পলিসির জন্য স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই নম্বরের মাধ্যমে প্রতিটি পলিসিকে কেন্দ্রীয়ভাবে শনাক্ত করা যাবে। ফলে একই পলিসি বা ব্যবসার তথ্য একাধিকভাবে দেখানো, ভুয়া প্রিমিয়াম আয় দেখানো কিংবা ব্যবসার একটি অংশের তথ্য গোপন করার সুযোগ কমবে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

সাধারণ বীমার ক্ষেত্রেও তথ্য যাচাইয়ের একটি নতুন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো পণ্য আমদানির জন্য ব্যাংকে ঋণপত্র খোলার আগে সংশ্লিষ্ট বীমা কভার নোটের তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যবস্থায় যাচাই করা হবে। স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর ছাড়া কভার নোট গ্রহণের সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

দুর্বল কোম্পানির গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ

আর্থিকভাবে সংকটাপন্ন কয়েকটি বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি পরিশোধের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। মীর নাদিয়া নিনভিন জানান, আগামী সপ্তাহ থেকে সাত থেকে আটটি দুর্বল বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও নগদায়নের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ ব্যবহার করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এসব প্রতিষ্ঠানের জমি, সরকারি ঋণপত্র, স্থায়ী আমানতসহ বিভিন্ন সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানে পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখা হচ্ছে। পরে ওই অর্থ থেকে গ্রাহকদের পাওনা দাবি পরিশোধ করা হবে।

একটি সংকটাপন্ন বীমা কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের কাছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ফেনীতে থাকা জমি বিক্রি এবং কিছু সরকারি ঋণপত্র নগদায়নের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে কয়েক শ কোটি টাকা সংগ্রহ করে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ

বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্যের সত্যতা যাচাই আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে বীমা কোম্পানির দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হলে আয়, ব্যবসা ও আর্থিক কার্যক্রমের প্রকৃত চিত্র যাচাই করা সহজ হবে। একই সঙ্গে তথ্য গোপন বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।

বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ৮২টি বীমা কোম্পানির কার্যক্রম তদারকি করছে। এর বিপরীতে সংস্থাটির জনবল প্রায় ১৫০ জন। এত কম জনবল দিয়ে পুরো বীমা খাতকে কার্যকরভাবে নজরদারি করা কঠিন হওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি এবং শক্তিশালী আইনি কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।

বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে তথ্যের ঘাটতি, গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে বিলম্ব এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গোপন ও অতিরিক্ত সার্ভার বন্ধ করে সব তথ্য একটি ব্যবস্থায় আনার নির্দেশনাকে তদারকি কাঠামো শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, পলিসির স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যের সমন্বিত যাচাই চালু হলে বীমা কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষার সুযোগও আরও শক্তিশালী হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।