জন্মদিনে হাবিব ওয়াহিদের বর্ণিল সংগীতযাত্রার স্মৃতিচারণ

বাংলা গানের আধুনিক ধারায় নতুনত্ব, সুরের বৈচিত্র্য ও ব্যতিক্রমী সংগীতায়োজনের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন সংগীতশিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হাবিব ওয়াহিদ। আজ ১৫ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন। ১৯৭৯ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সংগীতশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদের ছেলে হাবিব ছোটবেলা থেকেই সংগীতের আবহে বেড়ে উঠেছেন। তবে পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের সৃষ্টিশীলতা, কাজের ধরন ও সংগীত নিয়ে নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়।

হাবিবের সংগীতজীবনে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৩ সালে। ওই বছর প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। অ্যালবামটির গান শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে। বাংলা লোকগানের পরিচিত সুরের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতপ্রযুক্তির সমন্বয় তাঁর কাজকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ঐতিহ্যবাহী সুরকে সমসাময়িক সংগীতের কাঠামোয় উপস্থাপনের এই পদ্ধতি তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। একই সঙ্গে বাংলা গানের প্রযোজনায় নতুন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্ভাবনাও সামনে আসে।

‘কৃষ্ণ’-এর সাফল্যের পর হাবিব একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দেন। ‘ময়না গো’, ‘শোনো’ ও ‘বলছি তোমাকে’সহ তাঁর বেশ কয়েকটি গান শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি লাভ করে। এসব গানে সুরের মাধুর্য, আধুনিক সংগীতায়োজন এবং সহজে মনে থাকার মতো সুরের ব্যবহার তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। গায়ক হিসেবে পরিচিতি পেলেও সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।

হাবিবের কাজ কেবল নিজের গান কিংবা অ্যালবামে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নতুন কণ্ঠশিল্পীদের পরিচিত করে তোলা, টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল তৈরি এবং চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনাতেও যুক্ত হয়েছেন তিনি। বিভিন্ন ধরনের সংগীত নির্মাণের অভিজ্ঞতা তাঁর কাজের পরিধি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় লোকজ সুরের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও স্টুডিও প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলা গানের উপস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তিনি। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে আধুনিক সংগীত প্রযোজনার বিভিন্ন কৌশলও শ্রোতাদের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।

হাবিবের সংগীতজীবনের সমসাময়িক সময়ে সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক ফুয়াদ আল মুক্তাদিরও আধুনিক ধারার গান নিয়ে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁদের কাজের ধরনে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকলেও সমসাময়িক বাংলা গানে প্রযুক্তিনির্ভর প্রযোজনা ও নতুন সাউন্ডের ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। এই সময়ের সংগীতচর্চায় বিভিন্ন শিল্পীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাংলা গানের শ্রোতাদের রুচি ও প্রত্যাশায় পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখে।

চলচ্চিত্রের সংগীতেও নিজের দক্ষতার স্বীকৃতি পেয়েছেন হাবিব। ২০১১ সালে ‘প্রজাপতি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এই স্বীকৃতি তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন। চলচ্চিত্রের আবহ ও গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংগীত নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবেও পুরস্কারটি গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে হাবিব ওয়াহিদ নানা ধরনের সুর, গায়কী ও সংগীতায়োজন নিয়ে কাজ করেছেন। সংগীতের ধরন ও শ্রোতাদের পছন্দে পরিবর্তন এলেও নিজের কাজের মধ্য দিয়ে তিনি পরিচিতি ধরে রেখেছেন। তাঁর সংগীত নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও বাংলা গানের আধুনিক ধারায় তাঁর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে লোকগানের সুরকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন এবং আধুনিক সংগীতপ্রযুক্তির সঙ্গে দেশীয় সংগীতের মেলবন্ধন ঘটানোর ক্ষেত্রে তাঁর কাজ আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

হাবিব ওয়াহিদের সংগীতযাত্রা বাংলাদেশের জনপ্রিয় গানের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যবাহী সুরকে সমসাময়িক সংগীতের ভাষায় উপস্থাপনের একটি ধারা আরও পরিচিতি পেয়েছে। জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘ পথচলা ফিরে দেখার পাশাপাশি বাংলা গানের আধুনিকায়নে তাঁর অবদানও নতুন করে আলোচনায় আসে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।