খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
স্মরণ
বাংলা সাহিত্যের আকাশে কিছু নক্ষত্র আছেন, যাঁদের আলো সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পথ দেখায়। আশাপূর্ণা দেবী তেমনই এক দীপ্তিমান নক্ষত্র। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নন; তিনি ছিলেন জীবনদ্রষ্টা কথাশিল্পী, সমাজ-পর্যবেক্ষক, মানবিক চেতনার এক অনন্য কণ্ঠস্বর এবং বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা ও মুক্তির সংগ্রামের অন্যতম সাহিত্যিক ভাষ্যকার।
তাঁর সাহিত্যকর্মে ধরা পড়েছে মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, সমাজের অদৃশ্য বৈষম্য, নারীর নিঃশব্দ কান্না এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন কেবল আইন বা শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে নয়—মানুষের মনন, বিবেক ও মূল্যবোধের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই সম্ভব। সেই বিশ্বাসই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে অনন্য শক্তি ও স্থায়িত্ব।
আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম ১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি কলকাতার এক রক্ষণশীল, শিক্ষানুরাগী পরিবারে। বাবা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ছিলেন চিত্রশিল্পী এবং মা সরলাসুন্দরী দেবী ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী। সে সময়ের সামাজিক প্রথার কারণে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রচলন ছিল না। ফলে তিনি কখনো স্কুল বা কলেজে পড়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু জ্ঞানের প্রতি তাঁর অপরিসীম তৃষ্ণা, বইয়ের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা এবং আত্মপ্রচেষ্টাই তাঁকে গড়ে তোলে এক অসাধারণ স্বশিক্ষিত সাহিত্যিক হিসেবে। ঘরের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও তিনি চিন্তার জগৎকে করে তুলেছিলেন সীমাহীন।
মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় শিশুদের পত্রিকায়। এরপর শুরু হয় এক অবিশ্রান্ত সাহিত্যযাত্রা। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অক্লান্তভাবে লিখে গেছেন। তাঁর কলম থেকে জন্ম নিয়েছে দেড় শতাধিক উপন্যাস, আড়াই হাজারেরও বেশি ছোটগল্প, অসংখ্য শিশুতোষ রচনা, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা। বাংলা সাহিত্যে এত বিপুল ও বহুমাত্রিক সৃষ্টিসম্ভারের দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।
আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যজগৎ মূলত মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে নারীর নীরব যন্ত্রণা, অবদমিত স্বপ্ন, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক নিপীড়ন এবং আত্মমর্যাদার সংগ্রাম তাঁর লেখায় অসাধারণ শিল্পরূপ লাভ করেছে। তিনি কোনো স্লোগানধর্মী ভাষায় কথা বলেননি; বরং জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্য দিয়ে এমন সত্য তুলে ধরেছেন, যা পাঠকের হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তাঁর ভাষা সহজ, স্বচ্ছ ও অনাড়ম্বর হলেও তার অন্তর্নিহিত শক্তি অসাধারণ। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে তিনি অসাধারণ শিল্পে রূপ দিয়েছেন।
তাঁর অমর সৃষ্টি ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’ এবং ‘বকুলকথা’—বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ত্রয়ী। তিন প্রজন্মের নারীর জীবন, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক মহাকাব্যিক দলিল এই তিনটি উপন্যাস। এই ত্রয়ী শুধু সাহিত্য নয়, বাঙালি সমাজের ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব বোঝারও এক মূল্যবান দলিল।
এছাড়া ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘যোগবিয়োগ’, ‘বলয়গ্রাস’, ‘ছায়াসূর্য’, *‘নবজন্ম’*সহ অসংখ্য উপন্যাস এবং ছোটগল্পে তিনি মানুষের অন্তর্জগতের সূক্ষ্মতম অনুভূতিকে এমন দক্ষতায় তুলে ধরেছেন, যা আজও পাঠককে মুগ্ধ করে। তাঁর বহু উপন্যাস চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ধারাবাহিকে রূপায়িত হয়েছে এবং বাংলা সংস্কৃতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
অসামান্য সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৭৬)। এছাড়া তিনি অর্জন করেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মশ্রী, দেশিকোত্তমসহ অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল কোটি কোটি পাঠকের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁর সাহিত্যকে আপন করে নেওয়ার বিরল সম্মান।
১৯৯৫ সালের ১৩ জুলাই এই মহীয়সী সাহিত্যিক পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁর সৃষ্টিশক্তিকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর প্রতিটি উপন্যাস, প্রতিটি গল্প আজও আমাদের সমাজ, পরিবার এবং মানবিক সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি দেখিয়েছেন—সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না, নীরব প্রতিবাদও একদিন ইতিহাস রচনা করে, আর শিক্ষা ও আত্মমর্যাদাই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ।
আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই কালজয়ী কথাশিল্পীকে। বাংলা ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, বাঙালির সাহিত্যচর্চা যতদিন অব্যাহত থাকবে, ততদিন আশাপূর্ণা দেবীর সৃষ্টি আমাদের চেতনা, মানবিকতা ও সমাজবোধকে আলোকিত করবে। তাঁর অমর সাহিত্য উত্তর প্রজন্মকে সত্য, ন্যায়, সাম্য এবং মানবমুক্তির পথেই অনুপ্রাণিত করে যাবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, আশাপূর্ণা দেবী। আপনার কলম থেমে গেছে, কিন্তু আপনার সৃষ্টি আজও বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক অবিনাশী দীপশিখার মতো জ্বলছে—আলোকিত করছে মানুষের মন, বিবেক ও আগামী দিনের পথ।