২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহত হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছেন মাদারীপুরের কালকিনির মো. রায়হান। তাঁর চিকিৎসায় থাইল্যান্ডে সরকারের অন্তত ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি নিয়মিত সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন। তবে তাঁর আহত হওয়ার প্রকৃত সময় ও ঘটনা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর অসংগতি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গণ-অভ্যুত্থানে নয়, বরং স্থানীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষে বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে তাঁর পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকের পাড়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হন রায়হান।
স্থানীয়দের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের পরস্পরবিরোধী বিবরণ এবং চিকিৎসার নথিতে উল্লেখ করা তারিখ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কীভাবে তিনি জুলাই আন্দোলনে আহত হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেন, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলো এবং বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়া কী ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় সংঘর্ষে আহত হওয়ার অভিযোগ
মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার চর ঠেঙ্গামারা গ্রামে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় রায়হানের হাতে থাকা একটি বোমা প্রতিপক্ষের ছোড়া ইটের আঘাতে বিস্ফোরিত হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
রায়হান ওই গ্রামের বাদশা হাওলাদার ও জাহেদা বেগমের ছেলে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহিনের দাবি, রায়হান যে ঘটনায় আহত হয়েছিলেন, সেটি ছিল স্থানীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষ। এর সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
শাহিন বলেন, ৮ আগস্ট চর ঠেঙ্গামারা এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় রায়হানের হাতে বোমা ছিল। প্রতিপক্ষের ছোড়া ইটের আঘাতে সেটি বিস্ফোরিত হলে তিনি আহত হন। তাঁর প্রশ্ন, স্থানীয় সংঘর্ষে আহত একজন কীভাবে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন?
পৌর এলাকার দক্ষিণ রাজদী গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর মোল্লাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, রায়হান স্থানীয়দের সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ওই এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনের কর্মসূচিতে রায়হানকে আহত হতে দেখেননি তাঁরা। তাঁদের দাবি, ৮ আগস্টের সংঘর্ষেই তিনি আহত হন। বোমা বহনের অভিযোগের কারণে এলাকায় অনেকে তাঁকে ‘বোমা রায়হান’ নামে চেনেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের এসব বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের অভিযোগকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনার প্রকৃত বিবরণ জানতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসার নথি এবং সরকারি যাচাইসংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
পরিবারের দাবি, আহত হয়েছিলেন ৫ আগস্ট
রায়হানের পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকের পাড়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় আহত হন তিনি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলনে আহত হিসেবে তিনি সরকারি চিকিৎসাসুবিধা পান।
কিন্তু পরিবারের এই দাবির সঙ্গে স্থানীয়দের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি। মাদারীপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী কামরুল হাসান দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শকুনি লেক এলাকায় ছাত্রলীগ ও পুলিশের মধ্যে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
রায়হানের আহত হওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে চিকিৎসার নথিতে উল্লেখ করা তারিখ ঘিরেও। নথি অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ভর্তি হন। হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের কাছে পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, রায়হান ৫ আগস্ট আহত হয়েছিলেন। অন্যদিকে স্থানীয়দের বক্তব্য, ৮ আগস্টের সংঘর্ষে তিনি আহত হন। হাসপাতালে ভর্তির তারিখ ৮ আগস্ট হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি ৫ আগস্ট আহত হয়ে থাকলে হাসপাতালে ভর্তি হতে তিন দিন সময় লাগল কেন।
তবে হাসপাতালে ভর্তির তারিখ একাই আহত হওয়ার প্রকৃত সময় বা স্থান প্রমাণ করে না। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হাসপাতালের ভর্তি-সংক্রান্ত নথি, চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ, আঘাতের বিবরণ এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রায়হানের মা জাহেদা বেগম প্রথমে দাবি করেন, ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের লেকের পাড়ে সংঘর্ষে তাঁর ছেলে আহত হয়েছিলেন। তবে পরবর্তী কথোপকথনে তিনি ৮ আগস্টের সংঘর্ষের বিষয়টি স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়হানের বাবা বাদশা হাওলাদারও ছেলের ঘটনায় ‘ভুল হয়ে গেছে’ বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তাঁর ছেলে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় সে থাইল্যান্ডে চিকিৎসার সুযোগ পেল, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না।
পরিবারের বক্তব্যে এই অসংগতি এবং স্থানীয়দের অভিযোগের কারণে রায়হানের আহত হওয়ার প্রকৃত ঘটনা এখনো স্পষ্ট নয়।
যাচাইপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও যাচাইয়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি কাজ করেছে। জেলা পর্যায়ে ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন জেলা প্রশাসক এবং সদস্যসচিব ছিলেন সিভিল সার্জন। কমিটিতে দুজন ছাত্র প্রতিনিধিও যুক্ত ছিলেন।
যাচাইপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া ছাত্র প্রতিনিধি হাফেজ হাসিবুল্লাহ বলেন, উপজেলা পর্যায়ে তথ্য যাচাই করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছিল। জেলা পর্যায়ে তাঁরা মূলত সেই তথ্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি)সহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ও সংশ্লিষ্ট যাচাই কমিটির সদস্যসচিব শরীফুল আবেদীন কামাল বলেন, তালিকাটি ঢাকা থেকে অনলাইনে আপলোড করা হয়েছিল। স্থানীয় পর্যায়ে তাঁরা শুধু স্বাক্ষর করে দিয়েছেন।
এই বক্তব্যের পর যাচাইপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলা পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, জেলা কমিটির সদস্যরা কোন নথির ভিত্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন এবং চূড়ান্ত তালিকা তৈরির সময় আহত হওয়ার ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে কী ধরনের প্রমাণ বিবেচনা করা হয়েছিল—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাইয়ের কথা বলা হলেও রায়হানের ক্ষেত্রে ঠিক কোন তথ্য বা তদন্তের ভিত্তিতে তাঁকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। তাঁর নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্তির সময় কোনো অসংগতি ধরা পড়েছিল কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
থাইল্যান্ডে চিকিৎসায় সরকারের ব্যয় ৮০ লাখ টাকা
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে রায়হানের চিকিৎসার পেছনে সরকারের অন্তত ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি নিয়মিত সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন।
তবে বিদেশে চিকিৎসার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, কোন চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর চিকিৎসা হয়েছে, ব্যয়ের খাতগুলো কী ছিল এবং অর্থ ছাড়ের জন্য কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর আহত অনেক মানুষের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কিংবা বিদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে প্রকৃত আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও সুবিধাভোগীদের সঠিক পরিচয় যাচাই করাও জরুরি।
যদি কোনো ব্যক্তি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি সুবিধা পেয়ে থাকেন, তাহলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অনিয়মের জন্য দায়ী করা সমীচীন নয়। রায়হানের ক্ষেত্রেও চিকিৎসার অনুমোদন, সরকারি ব্যয়ের হিসাব এবং তালিকাভুক্তির নথি পরীক্ষা করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
এলাকা ছেড়েছেন রায়হান, তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রায়হান এলাকা ছেড়ে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে নিজের আহত হওয়ার ঘটনা, জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তি এবং থাইল্যান্ডে চিকিৎসার বিষয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কালকিনির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিশোর কুমার দাশ বলেন, তিনি ওই উপজেলায় নতুন যোগ দিয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে খোঁজ নিয়ে ঘটনার তদন্ত করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
এখন মূল প্রশ্নগুলো হলো—রায়হান ঠিক কবে ও কোথায় আহত হয়েছিলেন, তাঁর নাম সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি কী ছিল এবং থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অধিকার সুরক্ষিত রাখা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সহজ হবে।


