জেন-জির আন্দোলন: পরিবর্তনের স্বপ্ন নাকি অচলাবস্থার ফাঁদ?

বিশ্বের নানা প্রান্তে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক আন্দোলনের অগ্রভাগে উঠে এসেছে। এই প্রজন্ম হলো জেনারেশন-জি বা জেন-জি, যারা তথ্যপ্রযুক্তিতে অভ্যস্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্চকাঙ্ক্ষী। 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনগুলো দেশগুলোর জন্য কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনছে? নাকি উল্টো সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

লিবিয়া, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালের মতো দেশগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতায় বারবার সামনে এসেছে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ফেসবুক, টুইটার বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা দ্রুত জনমত গড়ে তোলে, রাস্তায় নামে এবং স্বল্প সময়ে বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আন্দোলন সরকারের পতন পর্যন্ত গড়িয়েছে।

প্রথমদিকে এসব আন্দোলন সাধারণ দাবি দিয়ে শুরু হয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু পরবর্তীতে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে এবং দাবিগুলো পূরণের আগেই সরকার পতনের ডাক উঠে। এর ফলে ক্ষমতা পরিবর্তন হলেও প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না, বরং অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়।

ezgif 8f558bebc74ef4 জেন-জির আন্দোলন: পরিবর্তনের স্বপ্ন নাকি অচলাবস্থার ফাঁদ?

এখানেই বড় প্রশ্ন তৈরি হয় সরকার পতনের পর দেশের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যায়? নতুন নেতৃত্ব কতটা দক্ষ? অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হঠাৎ পতনের পর নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হয়। সুযোগ নেয় উগ্রপন্থী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। উন্নয়নশীল অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, বিনিয়োগ বন্ধ হয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সাধারণ মানুষ আরও ভোগান্তিতে পড়ে।

লিবিয়া, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দেয় যে আন্দোলনের পর রাষ্ট্র কাঠামো টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে দেশটি কার্যত ভেঙে পড়ে, তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতিও ধ্বংসের পথে যায়।

শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন সরকার পতন ঘটালেও পরবর্তীতে দেশ আরও কঠিন ঋণ ও বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে পড়ে; খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে।

সর্বশেষ আমরা নেপালে জেন-জির আন্দোলন দেখলাম, ধ্বংসযজ্ঞও দেখলাম। সেখানে রাজতন্ত্র পতনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে ঠিকই নতুনভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ ভয়ানক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ভয়ে দেশ ছাড়ছে সাধারণ জনগণও। এই অস্থিতিশীলতা কখন সারবে কেউ বলতে পারি না। এখন সেখানে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলমান। তারা কি পারবে দেশকে পুনরুদ্ধার করতে, নাকি ছায়া সরকার এই দেশকেও গ্রাস করবে?

ঠিক একই ঘটনা ঘটলো বাংলাদেশে। গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সরকারেরও পতন ঘটায় জেন-জিরা। এর পর থেকে দেশ চলে যায় এক অনিশ্চয়তার দিকে। মানুষের উন্নত রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।  বর্তমানে দেশটি ছায়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলছে, যার কার্যকরী উপস্থিতি নেই।  সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই, বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। রাজনীতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে উদ্রপন্থাদের প্রভাব। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থমকে গেছে এবং প্রশাসনিক অবকাঠামোসহ রাষ্ট্রের কাঠামোও ভেঙ্গে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশের মানুষ মুক্তি পাবে কি, তা এখন কেবল স্বপ্নের বিষয়।

ezgif 1ff355f89fc191 1 জেন-জির আন্দোলন: পরিবর্তনের স্বপ্ন নাকি অচলাবস্থার ফাঁদ?

আন্দোলন বদলের হাতিয়ার, তবে প্রশ্ন হলো, জেন-জিরা আসলে কী চায়? পরিবর্তনের স্বপ্ন থাকলেও তা কতটা বাস্তবসম্মত? শুধু পতন নয়, বিকল্প নেতৃত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। নইলে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ভেঙে পড়ে, কর্মসংস্থান হ্রাস পায়, সমাজ উগ্রপন্থার দিকে চলে যায়।

জেন-জি প্রজন্মের উচ্ছ্বাস ও সাহস নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানে, দ্রুত জনমত গড়ে তুলতে পারে। তবে কেবল প্রতিরোধ নয়, প্রয়োজন সৃজনশীল বিকল্প ও নেতৃত্বের নকশা। অন্যথায় আন্দোলনের পর পতন, আর পতনের পর অচলাবস্থা,  এই চক্র থেকে বের হতে পারবে না কোনো দেশই। 

খবরওয়ালা/এমএজেড

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।