খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৩৮ এএম
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শান্তি ঘোষণার পরপরই ভূখণ্ডজুড়ে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। রোববার (২ আগস্ট) ভোর থেকে চালানো রক্তক্ষয়ী এই বিমান ও ড্রোন হামলায় শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ অন্তত ১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, বিগত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটি একদিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগের মধ্যেই গাজার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত আবাসিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র অনুযায়ী, উত্তর গাজার রেমাল মহল্লায় বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি অস্থায়ী তাঁবুতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় এক শিশুসহ দুইজন এবং গাজা শহরের পশ্চিমে একটি চলন্ত গাড়িতে হামলায় চার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।
একই দিনে পশ্চিম গাজার আল-সুসি টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাটে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলায় এক দম্পতি ও তাদের শিশু সন্তান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহতরা হলেন ৩৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তার ২৯ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী শিশুপুত্র আজ্জাম।
দক্ষিণের খান ইউনিসের আল-কারারায় বিমান হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য—মাহমুদ (৩৮), তার স্ত্রী ফাতিমা (৩৭) ও তাদের শিশুকন্যা প্রাণ হারান। নাসের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ হামলায় ওই পরিবারের আরও ৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় নিজ ঘরে বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৮ বছর বয়সী প্রবীণ নাগরিক কামু আবু মুয়াইলিক ও তার স্ত্রী হুদা (৫৯)। এছাড়া পৃথক হামলায় মোটরবাইকে যাতায়াতকালে দুই ভাই এবং জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে আরও এক ফিলিস্তিনি নিহত হন।
হামলার গতিপথ কেবল আবাসিক ভবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ইসরায়েলি বাহিনী দেইর আল-বালাহের আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের গুদামগুলোতেও হামলা চালিয়েছে। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বুর্শ তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, “ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে ওষুধ সরবরাহ ধ্বংস করছে এবং রোগ-ব্যাধি ও স্বাস্থ্যহীনতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে।” এই হামলায় দুটি গুদাম পুরোপুরি ধ্বংস এবং দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর আগে শুক্রবার ‘বোর্ড অব পিস’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টাবিলাইজেশন ফোর্স’-এর সহযোগিতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি চুক্তি সম্পাদনের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন প্রস্তাবের এই রূপরেখাটি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস নীতিগতভাবে গ্রহণ করলেও ইসরায়েল সরকার এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করেনি, বরং গাজায় নতুন করে রক্তপাত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কাতারের দোহা ও মিশরের কায়রোতে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার পর থেকেও গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আগ্রাসন থামেনি। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া সাম্প্রতিক ডেটা নিচে তুলে ধরা হলো:
| হামলার খাত / তথ্যের বিবরণ | সংখ্যা ও প্রাসঙ্গিক তথ্য |
| সর্বশেষ একদিনে মোট নিহতের সংখ্যা | ১৯ জন ফিলিস্তিনি |
| আল-সুসি টাওয়ারের ফ্ল্যাটে নিহত | ৩ জন (আবদুল্লাহ, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির ও শিশু আজ্জাম) |
| আল-কারারা অ্যাপার্টমেন্টে নিহত | ৩ জন (মাহমুদ, স্ত্রী ফাতিমা ও তাদের কন্যা) |
| আল-কারারা অ্যাপার্টমেন্টে আহত | ৩ জন |
| দেইর আল-বালাহে নিজ বাড়িতে নিহত | ২ জন (প্রবীণ দম্পতি কামু ও হুদা) |
| দেইর আল-বালাহে মোটরবাইকে নিহত | ২ জন (দুই ভাই) |
| জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে নিহত | ১ জন |
| রেমাল মহল্লায় তাঁবুতে ড্রোন হামলায় নিহত | ২ জন (একটি শিশুসহ) |
| গাজায় চলন্ত গাড়িতে হামলায় নিহত | ৪ জন |
| অক্টোবর ২০২৫ পরবর্তী মোট নিহত | ১,২২২ জন |
| অক্টোবর ২০২৫ পরবর্তী মোট আহত | ৪,০৫৩ জন |
| আল-আকসা হাসপাতালের ক্ষতিগ্রস্ত গুদাম | ৪টি (২টি ধ্বংস, ২টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত) |
হামলার তীব্রতা ও চিকিৎসা অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক জীবনযাপন এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
মন্তব্য