আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক লেনদেনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকায় দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ডলার, ইউরো, পাউন্ডসহ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্য ওঠানামা করে। এর প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়, বিদেশে অর্থ পাঠানো, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা ক্ষেত্রে।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ডলারের দরে কিছুটা অস্থিরতা দেখা গেলেও বর্তমানে তা আগের তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরে এসেছে। কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলার ১২২ টাকা ৭৮ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে।
এর আগে গত জুলাই মাসের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। পরে ধাপে ধাপে ডলারের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় উঠেছিল। অর্থাৎ জুলাইয়ের শুরু থেকে একপর্যায়ে ডলারের দর ৯৭ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছিল।
সাম্প্রতিক এই দরবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ডলারের দাম সমন্বয় এবং টাকার মূল্য পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসে। তবে বর্তমানে ডলারের দর আবারও কিছুটা কমেছে। আজকের ১২২ টাকা ৭৮ পয়সার দর জুলাইয়ের শুরুর ১২২ টাকা ৮৫ পয়সার তুলনায় ৭ পয়সা কম।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দরের পরিবর্তন শুধু আমদানিকারকদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করে, তাদের ব্যয়ের একটি বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে ডলারের দাম বাড়লে একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতে বেশি টাকা ব্যয় হতে পারে। বিপরীতে ডলারের দর কমলে আমদানি ব্যয়ের ওপর কিছুটা চাপ কমার সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে প্রবাসী আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ শক্তিশালী হয়। এতে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আজকের সর্বনিম্ন মুদ্রা বিনিময় হারগুলো হলো—
| মুদ্রার নাম | বাংলাদেশি টাকায় বিনিময় হার |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২২ টাকা ৭৮ পয়সা |
| ইউরো | ১৪২ টাকা ৬৮ পয়সা |
| পাউন্ড | ১৬৬ টাকা ২১ পয়সা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৮ টাকা ৮৭ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৮ টাকা ৫৮ পয়সা |
| চীনা ইয়েন | ১৮ টাকা ৩০ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৬ টাকা ৯৭ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৯ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ৩৯ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৯৭ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৭১ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৬ টাকা ৯৪ পয়সা |
| সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৪৬ পয়সা |
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার দর নির্ধারণে শুধু ডলারের চাহিদা-সরবরাহ নয়, আমদানি-রপ্তানি লেনদেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ও বাজার তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব সূচকে পরিবর্তন এলে মুদ্রার বিনিময় হারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাজার তদারকি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক পরিস্থিতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা কিছুটা বেড়েছে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে খোলাবাজার ও আনুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হারের ব্যবধানও আগের তুলনায় কমেছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিমত।
ডলারের দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা পর্যন্ত ওঠার পর আবার ১২২ টাকা ৭৮ পয়সায় নেমে আসায় আমদানিকারক ও বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনকারী ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে মুদ্রার দর পরিবর্তনশীল হওয়ায় এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহ এবং সংশ্লিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে ব্যাংক ও খোলাবাজারে একই মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়দরে পার্থক্য থাকতে পারে। লেনদেনের ধরন, ব্যাংকভেদে নির্ধারিত হার এবং মুদ্রার প্রাপ্যতার ওপরও প্রকৃত দর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা, বিদেশে অর্থ পাঠানো কিংবা আন্তর্জাতিক লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ দর যাচাই করা প্রয়োজন।
উল্লেখিত বিনিময় হার যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে।


