খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মৃত্যুবরণকারী ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে (২৮) মাদকসহ আটকের অভিযোগে দায়ের করা মামলার এজাহার ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। মামলার নথিতে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা ঘটনাস্থলের ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পুলিশের জব্দের বিবরণের সঙ্গে মিলছে না। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—আটকের সময় লুঙ্গি পরা একজন ব্যক্তির ‘প্যান্টের ডান পকেট’ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের দাবি।
গত ২১ জুন সকালে ফরিদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আহাদুজ্জামান মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি দায়ের করেন। একই দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইশতিয়াক আহমেদ, যাকে ওই মামলার একমাত্র আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ জুন দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযানে যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করেন। পরে তাকে আটক করা হয়। এজাহার অনুযায়ী, উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ইশতিয়াক নিজেই স্বীকার করেন যে তাঁর কাছে গাঁজা রয়েছে এবং তিনি তাঁর প্যান্টের ডান পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো ১০০ গ্রাম গাঁজা বের করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
কিন্তু এই বর্ণনার সঙ্গে ঘটনার ভিডিওচিত্র এবং প্রত্যক্ষ তথ্যের স্পষ্ট অমিল রয়েছে। ২০ জুন বিকেল প্রায় পাঁচটার দিকে ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরে সেই আটকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ঘটনাটি দিনের আলোয় ঘটেছে, রাতের নয়। আরও দেখা যায়, ইশতিয়াকের পরনে ছিল লুঙ্গি ও জামা, কাঁধে একটি ল্যাপটপ ব্যাগ। পুলিশ সদস্যরা তাকে তল্লাশি করছেন এবং কয়েকজনকে তাকে চড় মারতেও দেখা যায়। একপর্যায়ে ইশতিয়াকের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে পড়ে থাকা একটি বস্তু দেখিয়ে একজন পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে এক পোঁটলা।’
এজাহারের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি পাওয়া গেছে মামলার দুই সাক্ষীর বক্তব্যে। মামলার সাক্ষী হিসেবে নাম থাকা মো. আলমগীর হোসেন জানান, পুলিশ যে স্থানকে ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছে, তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তিনি মধুখালী মরিচ বাজারে আরেক সাক্ষী ব্যবসায়ী বিনয় কুমার সাহার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন মোটরসাইকেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে তাঁর পরিচয়, ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বর লিখে নেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁকে মাদক মামলার সাক্ষী করা হয়েছে।
অপর সাক্ষী বিনয় কুমার সাহার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব না হলেও তাঁর ছেলে বাঁধন সাহা জানান, ঘটনার সময় তাঁর বাবা মরিচ বাজারের ভেতরে নিজেদের দোকানে ছিলেন, যা আটকের স্থান থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে। তাঁর দাবি, পরে পুলিশ এসে সাক্ষী হওয়ার কথা বললে তাঁর বাবা এতে রাজি হননি। এরপরও জোর করে একটি কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
মামলার নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, উদ্ধার করা কথিত ১০০ গ্রাম গাঁজা থেকে পাঁচ গ্রাম রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ মামলার আলামত হিসেবে জমা দেওয়া হয়। তবে রাসায়নিক পরীক্ষার আগে উদ্ধার হওয়া বস্তুটি আদৌ গাঁজা কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, এজাহারটি গোয়েন্দা পুলিশ প্রস্তুত করে থানায় জমা দিয়েছে। থানা সেটি ২১ জুন সকাল সোয়া ৬টার দিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এজাহারের ভাষা বা বিবরণের ওপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ডিবি পুলিশ যে তথ্য দিয়েছে, সেই অনুযায়ী মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় উদ্ধার হওয়া বস্তু প্রাথমিকভাবে মাদকসদৃশ মনে হলে মাদক আইনেই মামলা নেওয়া হয়। পরে রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে যদি সেটি মাদক হিসেবে প্রমাণিত না হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়।
একদিকে এজাহারে উল্লেখিত সময়, স্থান ও উদ্ধার প্রক্রিয়ার বর্ণনা; অন্যদিকে ভিডিওচিত্র, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আটকের সময় ইশতিয়াকের পরিধেয় পোশাক—সব মিলিয়ে মামলাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব অসংগতি তদন্তে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।