গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের চলমান আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি আজ সোমবার পঞ্চম দিনে পদার্পণ করেছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা আজ সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে ‘ব্লকেড’ বা অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন। সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ও মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মুহুর্মুহু মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। মিছিলে তারা “দাবি মোদের একটাই, ডুয়েট থেকে ভিসি চাই” অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। এই আন্দোলনের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর থেকেই ডুয়েটের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলনে নামেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক নেতাও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলন, উপাচার্য নিয়োগের জটিলতা এবং সংঘর্ষের সার্বিক চিত্র ও বিবরণ নিচে একটি ছকের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা হলো:
| আন্দোলনের বিবরণ ও মূল সূচক | সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সময়কাল এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি |
| আন্দোলনের বর্তমান স্থায়িত্ব ও দিন | আজ সোমবার পঞ্চম দিনে পদার্পণ (অবরোধ কর্মসূচি চলমান) |
| নবনিযুক্ত উপাচার্যের নাম ও পূর্ববর্তী কর্মস্থল | অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবাল, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় |
| আন্দোলনের প্রারম্ভিক সময়কাল | গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে শুরু |
| আন্দোলনকারীদের মূল দাবি | ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগ |
| রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিন ও সময় | গত রবিবার সকাল ১০টার দিকে |
| সংঘর্ষে আহত ব্যক্তির মোট সংখ্যা | পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ অন্তত ২৫ জন ব্যক্তি |
| আহত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ | অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন |
পুলিশ প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত রবিবার সকাল ৮টা থেকেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন কর্মসূচি নিয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন। সেই সময় নবনিযুক্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে এসে নিজ পদে যোগদান করতে পারেন—এমন একটি খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ আরও বেশি তীব্র রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে উত্তেজিত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারে বা মেইন গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলকে উদ্দেশ্য করে অশালীন ও উসকানিমূলক স্লোগান দিতে থাকেন।
এরই একপর্যায়ে রবিবার সকাল ১০টার দিকে নবনিযুক্ত উপাচার্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ ক্যাম্পাসে প্রবেশের উদ্দেশ্যে অবরুদ্ধ প্রধান ফটক খোলার চেষ্টা করেন। এই সময় গেট খোলার চেষ্টা করা পক্ষ এবং গেট আটকে রাখা আন্দোলনকারী পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে উভয় পক্ষ চরম উত্তেজনা থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সংঘর্ষ চলাকালীন দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, যা পুরো ক্যাম্পাস এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ডুয়েট দেশের একটি অন্যতম এবং বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার একাডেমিক পরিবেশ এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা অন্যান্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। তাই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন ও স্বার্থ সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া উচিত ছিল বলে তারা মনে করেন।
রবিবার সংঘটিত এই ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনায় গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন তিনজন কর্মকর্তাসহ সর্বমোট আটজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। এছাড়া দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় গাজীপুর সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন এবং দৈনিক দিনকাল পত্রিকার গাজীপুর প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেনসহ অন্তত ২৫ জন ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।



