দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, সেই সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। চলতি বছরের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০৩ জন। এর মধ্যে অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনেই মারা গেছেন ৫৮ জন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব থেকে। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৯৩ জন, যা চলতি বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির রেকর্ড।
রোববার (১১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়। বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আক্রান্তের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৯৯ হাজার ২৭৫ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৯২ হাজার ৪০৩ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৭৯৬ জন। অর্থাৎ, একদিকে যেমন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছেন, অন্যদিকে নতুন রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালগুলোকে।
সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরেও বাড়ছে প্রাণহানি
মাসভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ছিল ডেঙ্গুতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। ওই মাসে মারা গেছেন ১৪৮ জন। আগস্টে প্রাণহানি ছিল ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং জুনে ১৩ জন। মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়। বছরের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছিল।
অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনে ৫৮ জনের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। মাসের শুরুতেই এতসংখ্যক প্রাণহানি ঘটায় ডেঙ্গুর মৌসুমি বিস্তার নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। তবে মাসভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা থেকে রোগের প্রকোপের একটি চিত্র পাওয়া গেলেও আক্রান্তদের বয়স, শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা গ্রহণের সময় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত জটিলতাও মৃত্যুঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
ঢাকায় সর্বোচ্চ রোগী, অন্য বিভাগেও চাপ
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভাগভিত্তিক হাসপাতালে ভর্তির পরিসংখ্যানে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। এ বিভাগে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩০ জন রোগী। খুলনায় ৩০৪ জন, চট্টগ্রামে ২৯৩ জন এবং বরিশালে ২৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজশাহীতে নতুন রোগীর সংখ্যা ১৬০, রংপুরে ৮৪ এবং ময়মনসিংহে ৭০ জন।
ঢাকা বিভাগে এক দিনে এক হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হওয়া রাজধানী ও আশপাশের হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দেয়। তবে অন্যান্য বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী শনাক্ত হওয়ায় ডেঙ্গুকে কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধই প্রধান ভরসা
ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এ মশা বংশবিস্তার করে। বাসাবাড়ির ফুলের টব, অব্যবহৃত পাত্র, ছাদে পড়ে থাকা সামগ্রী, পানির ট্যাংক ও নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তাই সংক্রমণ কমাতে নিয়মিত এসব স্থান পরীক্ষা করা এবং জমে থাকা পানি অপসারণ করা জরুরি।
ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ। মশারি ব্যবহার, শরীরের অনাবৃত অংশ ঢেকে রাখা এবং মশা প্রবেশ করতে পারে এমন দরজা-জানালা সুরক্ষিত রাখার মতো পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অতিরিক্ত ঝিমুনি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করা থেকেও বিরত থাকা উচিত, কারণ কিছু ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যাওয়া এবং এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির নতুন রেকর্ড পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা, হাসপাতালের প্রস্তুতি বজায় রাখা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগ—এই সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণও ডেঙ্গুর বিস্তার কমানোর জন্য অপরিহার্য।


