দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০৭ জনে। অন্যদিকে, এক দিনে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৬৭ জন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গুবিষয়ক ড্যাশবোর্ডে প্রকাশিত তথ্য থেকে এসব পরিসংখ্যান জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ১ হাজার ৪৪২ জন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৩৩১ জন। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ডেঙ্গুর বিস্তার এবং মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে রয়েছে।
সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ প্রাণহানি
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের প্রথম কয়েক মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে মারা যান। মার্চ ও এপ্রিলে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। মে মাসে একজন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়।
তবে জুনের পর পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ৩৬ জন। আগস্টে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ জনে। সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ওই মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়, যা চলতি বছরের মাসভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ।
চলতি অক্টোবরেও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। মাসের প্রথম ১২ দিনে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬২ জন। এর মধ্যে গত ৬ অক্টোবর এক দিনেই সর্বোচ্চ ১০ জনের মৃত্যু হয়। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বর্ষা মৌসুমের শেষভাগেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমেনি; বরং রোগের বিস্তার ও প্রাণহানি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অক্টোবরে হাসপাতালে ভর্তি ২১ হাজারের বেশি
রোগী ভর্তির পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৮১ জন। ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪০৯ জনে। মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন।
জুন থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ২০ হাজার ৫৩৬ জন। সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। ওই মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন।
অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১ হাজার ৮২২ জন। মাসের বাকি সময়েও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে মাসের শেষ পর্যন্ত রোগী ভর্তির প্রকৃত সংখ্যা কত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
নারী-পুরুষের মৃত্যুর অনুপাত প্রায় সমান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৩০৭ জনের মধ্যে ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ নারী এবং ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীদের অংশ কিছুটা বেশি হলেও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি নয়।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বেন, তা কেবল নারী-পুরুষের পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা, বয়স, পূর্ববর্তী অসুস্থতা এবং সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্বরের সঙ্গে শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, টায়ার কিংবা অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এসব জায়গায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা এবং পানির পাত্র পরিষ্কার রাখা জরুরি।
একই সঙ্গে দিনের বেলায়ও এডিস মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মশারি, মশা প্রতিরোধক উপকরণ এবং শরীর যথাসম্ভব ঢেকে রাখে এমন পোশাক ব্যবহার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস এবং কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন জরুরি।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। জ্বর কমার সময় বা পরবর্তী সময়ে কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাওয়া এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৩০৭-এ পৌঁছানো রোগটির ব্যাপকতা স্পষ্ট করছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে প্রাণহানির বড় বৃদ্ধি এবং অক্টোবরে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা এবং মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগই ডেঙ্গুর ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রধান উপায়।


