শরীয়তপুরের ডামুড্যায় নিখোঁজের প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সোয়াইফ হোসেন (৩) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার সকালে বাড়ির বাইরে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগের মধ্যে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তল্লাশি শুরু করেন। পরে পাশের একটি বাড়ির পেছনের ডোবা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় হত্যায় জড়িত থাকার সন্দেহে রাসেল শিকদার নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ স্থানীয়দের একটি অংশ শিশুটির পরিবারের সঙ্গে বিরোধ থাকা এক প্রতিবেশীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে ডামুড্যা উপজেলার শিধলকুড়া ইউনিয়নের পশ্চিম আদাসন এলাকায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত সোয়াইফ ওই এলাকার সেলিম সরদার ও শিমুলি দম্পতির সন্তান।
সকালে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৭টার দিকে বাড়ির বাইরে খেলতে যায় সোয়াইফ। কিছু সময় পর পরিবারের সদস্যরা তাকে দেখতে না পেয়ে আশপাশের এলাকায় খোঁজ শুরু করেন। বাড়ির চারপাশ, প্রতিবেশীদের বাড়ি ও সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও শিশুটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারে তল্লাশি শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে খোঁজাখুঁজির পর পাশের একটি বাড়ির পেছনের ডোবায় বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়।
দুপুরের দিকে মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে স্থানীয়দের ভিড় জমে যায়। শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের পাশাপাশি উত্তেজনাও তৈরি হয়।
পারিবারিক বিরোধের অভিযোগ
নিহতের স্বজনদের দাবি, প্রতিবেশী আলী আকবর শিকদারের পরিবারের সঙ্গে তাদের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। শনিবারের একটি তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝগড়াও হয়। ওই বিরোধের জেরেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তাঁরা।
তবে পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে শিশুটির হত্যার সরাসরি যোগসূত্র এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
শিশুটির বাবা সেলিম সরদার বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় তুচ্ছ একটি বিষয় নিয়ে তাঁর মায়ের সঙ্গে প্রতিবেশী আলী আকবরের পরিবারের সদস্যদের ঝগড়া হয়। পরে তাঁর মা তাঁকে বিষয়টি জানান। সকালে তিনি বাজারে যান। বাড়িতে ফিরে এসে ছেলেকে না পেয়ে খোঁজ শুরু করেন এবং পরে থানায় গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানান।
সেলিম সরদারের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তল্লাশি চালিয়ে আলী আকবরের বাড়ির পেছনের ডোবা থেকে তাঁর ছেলের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেন। সন্তান হত্যার বিচার দাবি করেছেন তিনি।
মরদেহ উদ্ধারের পর বাড়িতে আগুন
সোয়াইফের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কিছু লোক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে প্রতিবেশী আলী আকবর শিকদারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
তাৎক্ষণিকভাবে আগুনে বাড়িটির কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানা যায়নি। ঘটনার সময় আলী আকবর ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ছিলেন না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ফলে তাঁদের বক্তব্যও নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ কারণে শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় ওই পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশও এখন পর্যন্ত তদন্তের ভিত্তিতে হত্যার দায় কারও ওপর চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেনি।
তদন্তে হত্যার রহস্য খোঁজা হচ্ছে
পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। সন্দেহভাজন হিসেবে আটক রাসেল শিকদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শিশুটির মৃত্যুর কারণ, তাকে কোথায় এবং কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, মরদেহ বস্তাবন্দি করে ডোবায় কীভাবে নেওয়া হলো—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার সময় ও স্থান সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহও যাচাই করা হচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোসাইরহাট সার্কেল) শামসুল আরেফীন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে শিশুটির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে যেমন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটaনের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে সন্দেহের ভিত্তিতে প্রতিবেশীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার বিষয়েই এখন জোর দিচ্ছে পুলিশ।


