তাহসিফ হত্যা: বন্ধু দীপের সম্পৃক্ততার প্রমাণ, গ্রেপ্তার তরুণী

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। এ হত্যা মামলায় ‘দিশা’ নামের এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ। অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়ায় নিহত তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন তদন্তকারীরা। ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে দীপের দীর্ঘ সময় অবস্থান, তাঁদের টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়া এবং পরে দীপের একা ফিরে আসার বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ আহমেদ জানান, শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে দিশা নামের ওই তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন দিবাগত মধ্যরাত থেকে চার দিনের রিমান্ডে থাকা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে দিশার বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ বা মামলার ঘটনায় তাঁর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ।

এর আগে শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্তকারী সংস্থা তাঁর সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিল। আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ দোহা সুমন জানান, সুষ্ঠু তদন্ত এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন বিবেচনায় আদালত চার দিনের রিমান্ড অনুমোদন করেছেন।

নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বন্ধু দীপের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপ। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাঁদের চলাচল সম্পর্কে তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। ফুটেজ ও গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পেরেছে, দীপ তাহসিফকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন।

কিন্তু সেখান থেকে তাহসিফ আর ফিরে আসেননি। দীপ একাই ফিরে আসেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই বিষয়টি মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচনা করছেন কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে পাওয়া তথ্যের বেশ কিছু অসংগতি শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে তাহসিফকে কোথায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের শেষবার একসঙ্গে কোথায় দেখা গেছে এবং এরপর কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এসব অসংগতির কারণ জানতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে আটক, পরে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার

তাহসিফের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে আটক করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

মামলাটি হত্যা হিসেবে নথিভুক্ত হলেও লিখিত অভিযোগে তাহসিফের বাবা নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ করেননি। বরং ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে—এমন প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

বাসা থেকে নিখোঁজ, পরদিন নদীতে মিলল মরদেহ

২৮ বছর বয়সী কে এম তাহসিফ সাউরি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সন্ধান পাননি। পরদিন বুধবার বিকেলে টঙ্গীর রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।

নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার এমন মৃত্যু কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পরে মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার পেছনের ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়।

তদন্তে মৃত্যুর পরিস্থিতি, নিখোঁজ হওয়ার আগের সময়ের গতিবিধি এবং শেষবার কারা তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর চলাচলের তথ্য সংগ্রহে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে মিল-অমিল যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।

দীপের বক্তব্যে অসংগতি নিয়ে বাবার সন্দেহ

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, দীপ তাঁদের পরিবারের পরিচিত ছিলেন এবং প্রায়ই তাঁদের বাসায় যাতায়াত করতেন। ফলে ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর দেওয়া তথ্যকে শুরুতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দীপের বক্তব্যের সঙ্গে তদন্তে পাওয়া তথ্যের পার্থক্য সামনে আসায় তাঁর সন্দেহ তৈরি হয়।

উত্তরায় নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এনায়েতুল করিম বলেন, পিবিআইয়ের কাছে দীপ স্বীকার করেছেন, তাঁরা টঙ্গীতে গিয়েছিলেন। অথচ তাঁকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফকে তাঁদের বাসার চত্বরে নামিয়ে দিয়ে এসেছেন।

এ বিষয়ে তাহসিফের বাবা বলেন, “পিবিআইয়ের কাছে দীপ স্বীকার করেছে তারা টঙ্গী গিয়েছিল। অথচ সে আমাকে বলেছিল তাহসিফকে সে আমাদের বাসার চত্বরে নামিয়ে দিয়ে গেছে। এতেই বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আমি জানি না আসলে কী ঘটেছে বা এর পেছনে কারা জড়িত।”

ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রতিটি অস্পষ্ট দিক পরিষ্কার হবে এবং যারা প্রকৃত অর্থে দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে, দীপের রিমান্ড এবং দিশার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্ত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তাহসিফের মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন নদীতে তাঁর মরদেহ কীভাবে পৌঁছাল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যগুলো তদন্তের অংশ। দীপ বা গ্রেপ্তার হওয়া তরুণীর বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া বাকি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ, প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে। তাহসিফের পরিবারও সেই সত্য উদ্‌ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।