খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
আঁধারের আলোকবর্তিকা, নারী জাগরণের অগ্রদূত
বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানবতা ও নারী মুক্তির ইতিহাসে এক অনন্য নাম বেগম সুফিয়া কামাল। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য আবেগ, অনুভূতি, সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার দীপ্ত ইতিহাস। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ, মানবতাবাদী, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বর।
তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ধরা পড়েছে প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা, মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ, ব্যক্তিগত বেদনা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল প্রকাশ। বাংলা সাহিত্যে তিনি ছিলেন কোমলতার কবি, আর সমাজজীবনে ছিলেন প্রতিবাদ ও সাহসের প্রতীক।
১৯১১ সালের ২০ জুন বৃহত্তর বরিশালের শায়েস্তাবাদের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। যে সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সে সময় মুসলিম সমাজে নারীদের শিক্ষা ও স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। পর্দাপ্রথার কঠোর বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল নারীর জীবন। এমন প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি দমে যাননি।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও তিনি স্বশিক্ষায় নিজেকে গড়ে তোলেন। তাঁর মা সাবেরা খাতুনের কাছেই বাংলা ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর ছিল অদম্য আকাঙ্ক্ষা। পরিবারের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।
মাত্র তেরো বছর বয়সে, ১৯২৪ সালে, তাঁর বিয়ে হয় মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে। নেহাল হোসেন ছিলেন উদার ও আধুনিক চিন্তার মানুষ। তিনি সুফিয়া কামালকে সাহিত্যপাঠ ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করেন। এর ফলে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ সমকালীন সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন এবং সাহিত্যজগতে নিজের পথ নির্মাণ করতে শুরু করেন।
১৯২৬ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’। এর মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে তাঁর পদচারণা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি নারী বিষয়ক প্রগতিশীল সাময়িকী ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা বাঙালি মুসলিম নারীদের সাহিত্য ও চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং নারীদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন এবং মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়ান। স্বাধীনতার পর নারী অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার বাতিঘর।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম আজও প্রজন্মকে পথ দেখায়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পৃথিবী, শান্তি ও প্রার্থনা প্রভৃতি। গল্পগ্রন্থ কেয়ার কাঁটা, ভ্রমণকাহিনি সোভিয়েত দিনগুলি এবং মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল একাত্তরের ডায়েরি বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পুরস্কার এবং স্বাধীনতা পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননা।
১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর মহীয়সী এই নারী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস, মানবতা ও সাহিত্যকর্ম আজও আমাদের আলোকিত করে চলেছে।
বাংলাদেশের নারী জাগরণ, প্রগতিশীল সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের ইতিহাস যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় উচ্চারিত হবে একটি নাম— বেগম সুফিয়া কামাল।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
“নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার, হে বিধাতা?” — এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, তিনি আমাদের প্রিয় সুফিয়া কামাল।