খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ১:৪৮ পিএম
দেশে চলমান গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়েছে গ্রামাঞ্চলে। শহরগুলোর তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় অনিয়মিত লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জেলা শহরগুলোতে দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও, পল্লী অঞ্চলের অনেক স্থানে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও উদ্যোক্তাদের। এই ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে কৃষি, পোলট্রি এবং মৎস্য খাতের মতো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী প্রধান খাতগুলো আজ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
বিদ্যুতের এমন অনিয়মিত সরবরাহের কারণে ব্যাহত হচ্ছে সেচ কাজ, হিমায়িত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, বরফ উৎপাদন এবং চিংড়ি ঘেরের এয়ারেটর চালনা। অতিরিক্ত তাপে পোলট্রি খামারে অসংখ্য মুরগি মারা যাচ্ছে, কমছে ডিমের উৎপাদন। অন্যদিকে, হিমাগারগুলোতে পর্যাপ্ত তাপমাত্রা ধরে রাখতে না পারায় আলু, বীজ ও পেঁয়াজের মতো জরুরি কৃষি পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে ক্ষুদ্র খামারি, মৎস্যজীবী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তারা সরাসরি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বর্তমানে চলছে দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ সংগ্রহের ভরা সময়। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কক্সবাজার, চাঁদপুর, নোয়াখালী, বরিশাল এবং পটুয়াখালীর বরফকলগুলো তাদের স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। একটি ক্যান বা ব্লক বরফ তৈরি করতে টানা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে উৎপাদন সময় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বরফকলগুলো ধারণক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করতে পারছে।
বরিশালের কেডিসি এলাকার বরফকল শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় তারা চাহিদা অনুযায়ী বরফ সরবরাহ করতে পারছেন না। পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দরের ৩৬টি বরফকলে দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা। অনেক মিল দিনে ২০-২৫ ক্যান, আবার কোনটি সর্বমোট ২০০ ক্যানের বেশি বরফ তৈরি করতে পারছে না।
ফলশ্রুতিতে ১৫০ টাকার বরফের ক্যান বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। এমনকি খুলনা বা বরিশাল থেকে ট্রাকে করে অতিরিক্ত পরিবহণ খরচে বরফ এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে, যা প্রান্তিক জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। বরফ না পাওয়ায় অনেক জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না।
দেশের রপ্তানিমুখী হিমায়িত মৎস্য খাতের ৮০ শতাংশ চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ হয় খুলনায়। তবে চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও বটিয়াঘাটার চিংড়ি চাষিরা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। পানির স্বাভাবিক মান ও অক্সিজেনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখতে সেমি-ইনটেনসিভ ও নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে প্রতি ঘণ্টায় এয়ারেটর চালানো বাধ্যতামূলক।
বিদ্যুৎ না থাকায় এবং টানা লোডশেডিংয়ের কারণে এয়ারেটর বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা পানিতে অক্সিজেনের অভাব ঘটায় এবং রেণু পোনাসহ পূর্ণাঙ্গ চিংড়ি মারা যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ঋণগ্রস্ত খামারিরা বাধ্য হয়ে জেনারেটর ক্রয়ের পথ খুঁজছেন, যা তাদের উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী করে তুলছে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) মতে, পচনশীল চিংড়ি চাষ ও সুরক্ষায় সর্বক্ষণিক বিদ্যুৎ দরকার, যা বিঘ্নিত হলে কোটি কোটি টাকার রপ্তানি আয় হুমকির মুখে পড়বে।
লোডশেডিং ও তীব্র তাপদাহের দ্বিবিধ চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পোলট্রি খাত। শেডে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ফ্যান ও কুলিং সিস্টেম বন্ধ থাকায় তাপদাহে শ্বাসরোধ হয়ে লাখ লাখ টাকা মূল্যের মুরগির মৃত্যু হচ্ছে।
যশোরের ট্র্যাজেডি: অভয়নগরের বুইকরা গ্রামে দুই তরুণ উদ্যোক্তা যমজ ভাই (হাসান ও হোসেন) ঋণ নিয়ে আড়াই হাজার মুরগির একটি খামার পরিচালনা করছিলেন। রাতভর টানা ৮ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের সময় অতিরিক্ত তাপে বিক্রির উপযোগী ৪ শতাধিক মুরগি মারা যায়। এতে তাদের সোয়া লাখ টাকার ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়ে ৩ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি সাধিত হয়।
জয়পুরহাট ও চট্টগ্রামের চিত্র: জয়পুরহাটের ৬৫০টির বেশি লেয়ার খামার এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ১,০০০ এর বেশি ব্রয়লার খামার প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে।
বিদ্যুৎ বিলের বোঝা: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের খামারি মালেকের তিন খামারে দুই মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বিল এসেছে, যেখানে আগে প্রতি মাসে ১০-১২ হাজার টাকা খরচ হতো। একই সঙ্গে ডিজেলের খরচ যোগ হওয়ায় পরিচালন ব্যয় চরম রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে প্রায় ২ লাখ পোলট্রি খামার থাকলেও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ফিড ও ভ্যাকসিনের দাম বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংজনিত লোকসানের কারণে ২০২৫-২৬ নাগাদ তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজারে। অর্থাৎ বিগত ৫ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার পোলট্রি খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বৈদ্যুতিক পাম্প বা সেচ মোটর সময়মতো না চালানোয় কৃষিজমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। রাজশাহীর বাঘাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা সময়মতো পানি সরবরাহ করতে না পেরে ফসলহানির ঝুঁকিতে পড়েছেন।
অন্যদিকে, হিমাগারগুলোতে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হওয়ায় অতিরিক্ত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। জয়পুরহাটের কালাইয়ের কোল্ডস্টোরেজ মালিকদের মতে, বিকল্প জ্বালানির কারণে প্রতি মাসে তাদের অতিরিক্ত ১৫ লাখ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাপমাত্রা হেরফের হলে সংরক্ষিত বীজ আলু নষ্ট হয়ে আগামী মৌসুমের কৃষিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
পাবনার মতো প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলে ভরা বর্ষার মধ্যে অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও বায়ু চলাচলের (Air flow) অভাবে সংরক্ষিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পচে নষ্ট হয়ে গেছে, যা চাষিদের মণপ্রতি প্রায় ১,০০০ টাকা লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য করছে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই সংকট সামাল দিতে কৌশলগত রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই বিকল্প তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী।
সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলোর মধ্যে প্রধান হলো— কৃষকদের সেচ খরচ ও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি কমাতে ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুৎ চালিত (Solar-powered) সেচব্যবস্থায় রূপান্তর করা। পাশাপাশি, প্রান্তিক পর্যায়ে সোলার চালিত মিনি কোল্ডস্টোরেজ বিতরণ শুরু হয়েছে এবং পেঁয়াজ পচন রোধে ‘এয়ার ফ্লো’ আধুনিক প্রযুক্তিগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার কাজ চলছে।
| খাত/ক্ষেত্র | প্রধান সমস্যা | সরাসরি প্রভাব/ক্ষতি | সম্ভাব্য কারণ ও ভৌগোলিক চিত্র |
| মৎস্য (ইলিশ আহরণ) | বরফ উৎপাদনে ব্যাঘাত | ক্যানপ্রতি দাম ১৫০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় বৃদ্ধি, সাগরে যাওয়া থমকে আছে | পটুয়াখালী, বরগুনা, চাঁদপুর; বরফ তৈরিতে ১২-১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ লাগে |
| পোলট্রি (মুরগি ও ডিম) | শেডে বাতাস ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণহীনতা | জয়পুরহাট, যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে শত শত মুরগির মৃত্যু, ডিম উৎপাদন হ্রাস | টানা ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং; গত ৫ বছরে ৬৪,০০ খামারি ঝরে পড়েছেন |
| চিংড়ি চাষ | এয়ারেটর চালনা বন্ধ | পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি, রেণু পোনা ও মাছের মৃত্যু ঝুঁকি | খুলনা, কয়রা, পাইকগাছা; ৮০% চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত হয় এই অঞ্চলে |
| কৃষি (সেচব্যবস্থা) | বৈদ্যুতিক সেচ পাম্প অচল | জমিতে সময়মতো পানি না পাওয়া, ফলনে ধস | রাজশাহীসহ সারা দেশের গ্রামীণ কৃষি অঞ্চল |
| কৃষি (সংরক্ষণাগার/আলু) | হিমাগারের উপযুক্ত তাপমাত্রা ব্যাহত | আলু ও বীজ পচে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি | কুমিল্লা ও জয়পুরহাট; প্রতি হিমাগারে মাসে ১৫ লাখ টাকা বাড়তি জেনারেটর খরচ |
| কৃষি (পেঁয়াজ সংরক্ষণ) | এয়ার ফ্লো ব্যবস্থার বিকলতা | ২৫% থেকে ৩০% সংরক্ষিত পেঁয়াজে পচন | পাবনা জেলা; প্রতি মণে কৃষকের প্রায় ১,০০০ টাকা লোকসান |
| ব্যবসায়িক ব্যয় | ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার | পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি, খুচরা বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা | গ্রামীণ উদ্যোগ ও ক্ষুদ্র খামারসমূহ |
| পোলট্রি খামার বিল | বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও লোডশেডিং | ২ মাসে বিল ১.৫৬ লাখ টাকা (পূর্বের স্বাভাবিক বিলের চেয়ে বহুগুণ বেশি) | ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল |
| পোলট্রি খামারি বিলুপ্তি | ক্রমাগত ব্যবসায়িক লোকসান | খামারির সংখ্যা ২ লাখ থেকে কমে ১ লাখ ৩৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে | সারা বাংলাদেশ (২০২০ থেকে বর্তমানে) |
| সরকারি উদ্যোগ | বিদ্যুৎ নির্ভরতা কমানো | সৌরচালিত সেচ পাম্প ও মিনি কোল্ডস্টোরেজ বিতরণ | কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় |
মন্তব্য