বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজবাড়ী পৌরসভা মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে সংকটপূর্ণ উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি কঠিন সময় পার করছে। সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।’
অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের দুর্বলতা দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এবং বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে না থাকায় চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর।
শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বকে অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। তার মতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশীয় সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
দারিদ্র্য মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিকল্পিতভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও কর্মসূচিগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
জিডিপির হিসাব ও অর্থনৈতিক তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি
দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জিডিপিসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ভুল ধারণা এবং বিকৃত তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার হিসাব ও পূর্বাভাসে পার্থক্য থাকলে সেগুলোর পদ্ধতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যাংক খাত সংস্কারে প্রয়োজন ৪০ বিলিয়ন ডলার
দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাত সংস্কারে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে স্বজনপ্রীতি ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তার মতে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় অতীতের উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা
দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতীতে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, দেশে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আগের সরকার এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
গ্যাস অনুসন্ধানেও পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। অর্থ উপদেষ্টার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা
তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান অর্থ উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তার ঘটালেই হবে না, শিক্ষার্থীদের এমন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, যা কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব কমাতে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।
উপজেলা পর্যায়ে ১৫১ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নেও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য দক্ষ জনশক্তির পাশাপাশি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা জরুরি। এ কারণে স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২০ শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।
বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে ১৫১ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা, ব্যাংক খাত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।


