খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৩:১৮ পিএম
চার বছর আগে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকায় দুই তরুণীকে অপহরণ করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ছয় যুবককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে তা ভুক্তভোগী বা তাঁদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. এরশাদ আলম (জর্জ)।
দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন রাহুল (২৩), মো. ডায়মন্ড (২০), আফসার উদ্দিন অনিম (২২), পারভেজ হক পলাশ (২৫), মিনহাজ ওরফে মিনহাজ আবেদীন (২১) এবং মিনহাজ ওরফে বাবু ওরফে মিনহাজ বাবু (২৪)। তাঁদের মধ্যে রাহুল পলাতক রয়েছেন। আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। বাকি পাঁচ আসামিকে রায় ঘোষণার পর সাজা পরোয়ানার মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার নথি ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ জুন বিকেলে দুই ভুক্তভোগী তরুণী কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তাঁদের এক বন্ধুর জন্মদিন উদযাপনের উদ্দেশ্যে ঘুরতে বের হন। পরে রাত পৌনে ১০টার দিকে তাঁরা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পানকৌড়ি রেস্টুরেন্টে যান। সেখানে খাওয়া-দাওয়া শেষে বাসায় ফেরার জন্য তাঁরা শুভাঢ্যা এলাকায় অটোরিকশার সন্ধান করছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় আসামিরা একটি অটোরিকশা নিয়ে তাঁদের পথরোধ করে। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং মারধর করে দুই তরুণী ও তাঁদের সঙ্গে থাকা বন্ধুদের একটি অন্ধকার মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। মামলার বিবরণে ওই স্থানকে ‘রতনের খামার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ভুক্তভোগীদের বন্ধুদের মারধর করে তাঁদের কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর দুই তরুণীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, ধর্ষণের ঘটনার ভিডিও ধারণ করে আসামিরা। এ সময় ভুক্তভোগীদের মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের সঙ্গে থাকা বন্ধুরা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই তরুণীকে উদ্ধার করে।
ঘটনার চার দিন পর, ২০২২ সালের ২৯ জুন, এক তরুণীর বাবা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়। র্যাবের অভিযানে মিনহাজ ওরফে মিনহাজ আবেদীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে ভুক্তভোগীদের একজনের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই মোবাইল ফোনে দুই তরুণীর ওপর সংঘটিত ধর্ষণের ভিডিও পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা আদালতকে জানান।
পরে মামলার তদন্ত শেষ করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক শরজিৎ কুমার ঘোষ ছয় আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্র পর্যালোচনার পর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার নথি পর্যালোচনা শেষে আদালত ছয় আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
রায়ে প্রত্যেক আসামির ওপর এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করা হবে। পরে সেই অর্থ ভুক্তভোগী বা তাঁদের পরিবারের কাছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মামলার রায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর এসেছে। চার বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষ্যগ্রহণ, তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগ গঠন এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান। রায়ে একজন আসামি পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের আদেশ অনুযায়ী সাজা কার্যকর করার প্রক্রিয়া এগোবে।
মন্তব্য