আইএমএফের ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ২ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের পাশাপাশি এতে শ্রমবাজারের বিভিন্ন দুর্বলতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে গিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের বড় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত জ্ঞান ও নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান। চাকরিপ্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতার অভাব থাকে। আবার নিয়োগদাতারা যে ধরনের দক্ষ কর্মী খুঁজছেন, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সেই দক্ষতার ঘাটতিও দেখা যায়।
ফলে অনেক তরুণকে দীর্ঘ সময় চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত কাজ পেলেও নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার তুলনায় কম মানের পদে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাঁদের পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ সীমিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের দক্ষ জনশক্তিরও যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না।
অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। এসব কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় আনুষ্ঠানিক নিয়োগচুক্তি, স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা কিংবা পেশাগত উন্নয়নের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না। ফলে একজন ব্যক্তি কর্মরত থাকলেও তাঁর কর্মসংস্থান সব সময় নিরাপদ বা মানসম্মত হয় না।
আইএমএফের মতে, শ্রমবাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে শুধু বেকারত্বের হার বিবেচনা করলেই চলে না। কর্মীরা কী ধরনের কাজ করছেন, তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ রয়েছে কি না এবং কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ কতটা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি। আগামী বছরগুলোতে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আরও বড় হবে। এই জনশক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি চাকরির মান উন্নত করতে হবে।
বিশেষ করে উৎপাদন ও সেবা খাতে ভালো মানের কাজের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়লে তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের বাধা কমতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বদলাচ্ছে কর্মসংস্থানের ধরন
শ্রমবাজারের বিদ্যমান সমস্যার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অনেক পেশায় কাজের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। পাশাপাশি এআই ব্যবহার করতে পারেন, এমন কর্মীদের চাহিদাও বাড়ছে।
আইএমএফ এশিয়ার ১৯টি অর্থনীতির প্রায় চার কোটি অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশাগুলোতে কর্মীর চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, এআই-সম্পর্কিত দক্ষতা রয়েছে এমন কর্মীদের চাহিদা বেড়েছে।
এই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শেখা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আইএমএফ সতর্ক করেছে, বর্তমানে যেসব দেশে এআইয়ের প্রভাব তুলনামূলক কম, সেসব দেশও ভবিষ্যতে এ পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে পারে। উৎপাদন ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও প্রযুক্তির কারণে সেসব কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা বদলে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সময়োপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা গেলে চাকরিপ্রার্থীরা আরও প্রস্তুত হয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারবেন।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক পূর্বাভাস
শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও সতর্ক পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বেকার থাকলে অথবা তাঁদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পেলে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আইএমএফ। প্রযুক্তি ও এআইনির্ভর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার থেকে যেসব দেশ সুবিধা পাচ্ছে, তাদের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বেড়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে—একদিকে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা, অন্যদিকে পরিবর্তিত প্রযুক্তিগত পরিবেশের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ হতে পারে।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা শুধু ব্যক্তিগত জীবিকা অর্জনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের উৎপাদনশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রশ্নও জড়িত। তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করতে না পারলে দেশের ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অর্থনীতির প্রত্যাশিত শক্তিতে পরিণত হবে না।


