দৌলতপুরে ধর্ষণের অভিযোগের ন্যায়বিচার না পেয়ে গৃহবধূর আত্মহত্যার অভিযোগ পীরের ছেলের বিরুদ্ধে!

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় বিচারহীনতা, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নাছিমা বেগম (২৮) নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল এবং সর্বশেষে গ্রাম্য সালিশে ন্যায়বিচার না পাওয়ায় ক্ষোভে ও দুঃখে ওই নারী এই চরম পথ বেছে নেন বলে তাঁর স্বজনরা দাবি করেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে দৌলতপুর উপজেলার কলিয়া ইউনিয়নের তালুকনগর গ্রামে। নিহত নাছিমা বেগম ওই গ্রামের এক প্রবাসী যুবকের স্ত্রী ছিলেন।

ঘটনার পটভূমি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাছিমা বেগমের স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগে প্রতিবেশী শাকিল নামে এক যুবক তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। শাকিল স্থানীয় তালুকনগর গ্রামের প্রভাবশালী ইনসান পীর সাহেবের ছেলে। অভিযোগ অনুযায়ী, শাকিল বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নাছিমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং সুকৌশলে তার ভিডিও চিত্র ধারণ করে রাখেন।

পরবর্তীকালে এই আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে (ব্ল্যাকমেইল করে) নাছিমার কাছ থেকে ধাপে ধাপে প্রায় দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেন শাকিল। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর নাছিমা তাঁকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে শাকিল বিয়ে করতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানান এবং উল্টো তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও অপমান করেন।

পক্ষপাতমূলক গ্রাম্য সালিশ ও বিচারহীনতা

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হলে গত ১৮ জুলাই তালুকনগর গ্রামের ডক্টর আলমগীরের বাড়িতে একটি গ্রাম্য সালিশ বৈঠক বসানো হয়। নিহত গৃহবধূর পরিবারের অভিযোগ, সালিশে প্রভাবশালীদের চাপে নিরপেক্ষ বিচার করা হয়নি; বরং একতরফাভাবে অভিযুক্ত শাকিল ও তাঁর পরিবারের পক্ষ অবলম্বন করা হয়।

সালিশে উপস্থিত বিচারকদের ভূমিকা নিয়ে নিহতের ভাই রাসেল মিয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বোনটি ন্যায়বিচারের আশায় সালিশে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে প্রভাবশালীদের প্রভাবে অভিযুক্তদের সুবিধা দেওয়া হয় এবং আমার বোনকে অপমানিত করা হয়। বিচার না পেয়ে এবং চরম সামাজিকভাবে হেয় হয়ে আমার বোন আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।”

সালিশ বৈঠকে উপস্থিত প্রধান ব্যক্তিদের একটি বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তি ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের তালিকা
১. ডক্টর আলমগীর (যাঁর বাসভবনে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়)
২. শরিফ ইসলাম লালন (স্থানীয় ইউপি সদস্য)
৩. আলেক
৪. হাবেল
৫. জলিল
৬. শামসুল
৭. রবিজ্জল
৮. সুরমান
৯. আলিম
১০. আনোয়ার
১১. আলম
১২. সিরাজুল

আত্মহত্যা ও আইনি পদক্ষেপ

গ্রাম্য সালিশে বিচার না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নাছিমা বেগম। সালিশ শেষ হওয়ার পরদিন ভোরে নিজ বাড়ির রান্নাঘরের পাশে শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় তাঁর মরদেহ দেখতে পান স্বজনরা। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

এই ঘটনায় নিহতের বাবা মো. আব্দুল হক বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় শাকিলসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তের ব্ল্যাকমেইলিং সংক্রান্ত আরও কিছু ভিডিও তথ্যপ্রমাণ হিসেবে নিহতের স্বজনদের হাতে এসেছে। যদিও সেগুলোর সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হয়নি। দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্বপন কুমার সরকার জানান, “মামলা দায়েরের পরপরই অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।”

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।