দ্বীপের সম্পত্তি নিয়ে আইনি বিরোধে ব্রাজিলিয়ান তারকা রিচার্লিসন

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার রিচার্লিসনের সময়টা ভালো যাচ্ছে না মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে। টটেনহ্যাম হটস্পারের মূল দলে জায়গা হারানোর মধ্যেই এবার দ্বীপে কেনা একটি বিলাসবহুল বাড়ির দখল নিয়ে নতুন বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি। প্রায় এক কোটি ব্রাজিলিয়ান রিয়াল বিনিয়োগ করা ওই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য দেশটির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ও সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন এই ফরোয়ার্ড। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করতে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে অভিযোগগুলো সামনে আনেন রিচার্লিসন। তবে তাঁর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফ্লাভিও। ফলে সম্পত্তিটির মালিকানা, দখল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান ও ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ইউওএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিও দে জেনেইরোর উপকূলবর্তী আংরা দোস রেইস অঞ্চলের ইলিয়া কমপ্রিদি দ্বীপে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি বিরোধ চলছে। ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে করোনাভাইরাস মহামারির সময় সম্পত্তিটিতে বিনিয়োগের উদ্যোগ নেন রিচার্লিসন।

ফুটবলারের দাবি, ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে বাড়িটি কেনা ও সংশ্লিষ্ট কাজে প্রায় এক কোটি ব্রাজিলিয়ান রিয়াল বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। সে সময় আমেরিকা মিনেইরো ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি আলেনকার দা সিলভেইরা জুনিয়র এবং তাঁর সাবেক এজেন্ট রেনাতো ভেলাসকোর সঙ্গে যৌথভাবে সম্পত্তিটি কেনেন রিচার্লিসন।

পরবর্তী সময়ে কয়েকজন ব্যক্তি বাড়িটি কেনার আগ্রহ দেখান। তাঁদের মধ্যে ফ্লাভিও বোলসোনারোও ছিলেন বলে দাবি করেছেন ব্রাজিলিয়ান এই ফুটবলার। তবে ফ্লাভিওর কাছে সম্পত্তিটি বিক্রি করতে রাজি হননি তিনি। রিচার্লিসনের অভিযোগ, এরপর থেকেই বিরোধ জটিল আকার ধারণ করে এবং একপর্যায়ে সম্পত্তিটির দখল হারাতে হয় তাঁকে।

‘বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় দখল নিয়ে নেওয়া হয়েছে’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে নিজের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন রিচার্লিসন। তাঁর অভিযোগ, সম্পত্তিটি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর আদালতের মাধ্যমে কৌশলে সেটির দখল নেওয়া হয়েছে।

ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর কাছে দ্বীপটি বিক্রি করতে চাইনি। আর রাজি না হওয়ায় তারা আদালতের মাধ্যমে কৌশলে সেটির দখল নিয়ে নিয়েছে।’

রিচার্লিসনের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন সম্পত্তিটির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র ঠিক করার কাজ চলছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছিলেন, বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। কিন্তু অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক দ্রুততায় সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।

এ প্রসঙ্গে রিচার্লিসন বলেন, ‘ফ্লাভিও বোলসোনারো আর উইলার তোমাজ নামের ওই ব্যক্তি সেখানে গিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দ্বীপটির দখল নিয়ে নেন। এখানে বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। যত দূর জানি, তারা একটি পয়সাও খরচ না করে দ্বীপটি নিয়ে নিয়েছেন। আমি সেখানে প্রায় এক কোটি রিয়াল খরচ করেছি, কিন্তু কিছুই ফেরত পাইনি।’

তাঁর এই বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় উঠে এসেছে—সম্পত্তিটির দখল কীভাবে অন্য পক্ষের হাতে গেল এবং সেখানে বিনিয়োগ করা অর্থের কী হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে রিচার্লিসনের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই। সম্পত্তিটির বৈধ মালিকানা ও দখল হস্তান্তরের আইনি ভিত্তি নির্ধারণে আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

ফেডারেল পুলিশের তদন্ত চান রিচার্লিসন

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশের তদন্ত দাবি করেছেন রিচার্লিসন। নিজের বিনিয়োগ করা অর্থের পরিণতি সম্পর্কেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান তিনি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তাঁরা যেন ফ্লাভিও বোলসোনারোর কাছে এ বিষয়ে জবাবদিহি চান।

অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ব্রাজিলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবলারের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এবং একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি বাড়তি মনোযোগ পেয়েছে।

তবে ফ্লাভিও বোলসোনারো অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। ব্রাজিলিয়ান গায়িকা ও ইনফ্লুয়েন্সার জুলিয়েতের একটি ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে তিনি ঘটনাটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে দাবি করেন। এর জবাবে রিচার্লিসন প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে আমার দ্বীপটির কী হলো?’

এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর বিরোধটি আবারও আলোচনায় আসে। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে সম্পত্তিটির মালিকানা বা দখল হস্তান্তরের বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তিন বছর ধরে চলেছে আইনি বিরোধ

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সম্পত্তিটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বেশ পুরোনো। রিচার্লিসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকা বাড়িটি বর্তমানে আইনজীবী উইলার তোমাজের প্রতিষ্ঠান ডব্লিউটি আদমিনিস্ত্রাসাও দে ইমোভেইসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে রিও দে জেনেইরোর আদালতে প্রায় তিন বছর ধরে মামলা চলে। পরে বিরোধটি ব্রাজিলের উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০২৫ সালে আইনি লড়াইয়ে প্রতিকূল সিদ্ধান্ত আসার পর রিচার্লিসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ও তাঁর সাবেক এজেন্ট মামলা থেকে সরে দাঁড়ান বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এই আইনি ইতিহাস বর্তমান বিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সম্পত্তিটির দখল নিয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগের পাশাপাশি এর মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এবং আগের আদালতের সিদ্ধান্তও বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো সম্পত্তিতে অর্থ বিনিয়োগ করা এবং সেটির বৈধ মালিকানা প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। মালিকানা নির্ধারণে ক্রয়চুক্তি, অর্থ পরিশোধের নথি, নিবন্ধন এবং আদালতের সিদ্ধান্তের মতো বিষয় প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

ফ্লাভিও বোলসোনারো দাবি করেছেন, সম্পত্তিটির কেনাবেচা বা মালিকানার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনি বিরোধে তাঁকে শুধু সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, রিচার্লিসনের অভিযোগে তাঁর নাম এলেও সম্পত্তিটির দখল নেওয়ার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, আইনজীবী উইলার তোমাজও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি রিচার্লিসনকে সম্পত্তিটির বৈধ মালিকানা-সংক্রান্ত নথি এবং অর্থ পরিশোধের প্রমাণ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারলে কোনো অর্থ ছাড়াই সম্পত্তিটির অধিকার রিচার্লিসনের কাছে হস্তান্তর করবেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।

ফলে বিরোধটির নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সম্পত্তি কেনার সময়কার চুক্তি, বিনিয়োগের প্রমাণ এবং দখল হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য থাকায় এসব নথি ও বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা সম্ভব।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ফ্লাভিও বোলসোনারোর নাম উঠে আসায় বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্বও পেয়েছে। জাইর বোলসোনারোর ছেলে ও ব্রাজিলের বর্তমান সিনেটর ফ্লাভিও দেশটির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে একজন পরিচিত ফুটবলারের প্রকাশ্য অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে এমন বিতর্ক প্রার্থীর ভাবমূর্তি ও জনআলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলই প্রধান বিবেচ্য।

ফ্লাভিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং সম্পত্তিটির সঙ্গে নিজের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন। তাই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে, রিচার্লিসনের বিনিয়োগ ও সম্পত্তির দখল নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোরও যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

টটেনহ্যামেও কঠিন সময় কাটছে রিচার্লিসনের

মাঠের বাইরের বিরোধের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও কঠিন সময় পার করছেন রিচার্লিসন। টটেনহ্যাম হটস্পারের মূল দলে জায়গা হারিয়ে তিনি এখন কোচ রবের্তো দে জেরবির পরিকল্পনার বাইরে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি প্রিমিয়ার লিগের মূল দলের হয়ে নিয়মিত খেলার সুযোগ না পেয়ে তাঁকে অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলতে হচ্ছে।

ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ড একসময় টটেনহ্যামের আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। কিন্তু মূল দলে সুযোগ কমে যাওয়ায় তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নিয়মিত খেলার সুযোগ ফিরে পাওয়া এবং কোচের আস্থা অর্জন করা এখন তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

এর মধ্যে প্রায় এক কোটি রিয়াল বিনিয়োগ করা সম্পত্তির দখল নিয়ে বিরোধ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একদিকে ক্লাব ফুটবলে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধের নিষ্পত্তি—দুই ক্ষেত্রেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি রিচার্লিসন।

সম্পত্তিটির দখল কীভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে, বিনিয়োগ করা অর্থের কী পরিণতি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও বিরোধটির কেন্দ্রে রয়েছে। রিচার্লিসন তদন্ত চান, আর ফ্লাভিও বোলসোনারো ও উইলার তোমাজ তাঁর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই বিরোধের পরিণতি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।