লেখক এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: ৬ই জুন ২০২৫, ১:২৭ পিএম
বিংশ শতাব্দীর তুর্কি ভাষার এক দুর্জয় কবি, নাট্যকার ও বিপ্লবী—নাজিম হিকমত। তার কলম ছিল শিকল ভাঙার হাতিয়ার, তার কবিতা ছিল বন্দিশালার দেয়ালে জেগে ওঠা এক প্রতিবাদের কণ্ঠ। ‘জেলখানার কবিতা’-র জন্য তিনি আজ ইতিহাসে চিহ্নিত—একজন জেলখানার কবি হিসেবে, যিনি কারাগারের অন্ধকারে বসে লিখে গেছেন আলোর গান।
নাজিম হিকমতের জন্ম ১৯০২ সালের ১৫ জানুয়ারি, গ্রিসের সেলোনিকা অঞ্চলে। শৈশব থেকেই হৃদয়ে কবিতার আগুন বহন করে বেড়ানো এই কিশোর ১৯১৮ সালে তুর্কিশ নেভাল একাডেমি থেকে স্নাতক হন এবং যোগ দেন নৌবাহিনীতে।কিন্তু তার অন্তর যেন কখনোই সামরিক শৃঙ্খলার কাঠিন্যে বাঁধা পড়েনি—তাকে টেনেছিল মানুষের মুক্তি, সমতার স্বপ্ন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে, ১৯২২ সালে তিনি পাড়ি জমান মস্কো। সোভিয়েত বিপ্লবের আদর্শে দীক্ষা নিয়ে ১৯২৪ সালে তুরস্কের স্বাধীনতার পর ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে।
বামপন্থি চিন্তায় দেশবাসীকে উদ্দীপ্ত করায় তার বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। পালিয়ে আবারও চলে যান মস্কো, যেখানে কবিতা, গান ও বিপ্লবী চেতনার ফসল ফলাতে থাকেন একের পর এক। ১৯২৮ সালে সাধারণ ক্ষমার ডাকে দেশে ফিরে এলেও শান্তি ছিল অস্থায়ী।
পরবর্তী এক দশকে পাঁচ বছরের বেশি সময় তাকে কাটাতে হয় জেলখানায়। এই বন্দিত্বের মাঝেই তিনি রচনা করেন চারটি সুদীর্ঘ কবিতা ও আরও পাঁচটি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ। তুর্কি সাহিত্যে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা ঘটে, আর নাজিম হিকমত হয়ে ওঠেন জনতার কবি।
১৯৩৮ সালে রাষ্ট্র আবার তাকে বন্দি করে—এইবার অভিযোগ, সামরিক বাহিনীকে বিদ্রোহে উসকানি। রায় হয় ২৮ বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু জনগণের ক্রমাগত চাপে অবশেষে ১৯৫০ সালে মুক্তি পান তিনি।
সেই বছরই বিশ্ব সাহিত্যে আরেক দীপ্ত নাম—পাবলো নেরুদার সঙ্গে যৌথভাবে লাভ করেন বিশ্ব শান্তি পুরস্কার। তবু রাষ্ট্রের কুপিত চোখে তার প্রতি ছিল অনন্ত সন্দেহ। তুরস্কে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর, দুইবার তার ওপর চালানো হয় প্রাণঘাতী হামলা। বাঁচতে গিয়ে আবারও আশ্রয় নিতে হয় রাশিয়ায়। আর তার পরের বছর, নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় মাতৃভূমি।
তবুও কলম থেমে থাকেনি। হৃদয়ে দেশের মাটি, কল্পনায় মানুষের মুক্তি—সব মিলিয়ে এক অনির্বাণ আগুন জ্বলেছে তার কবিতায়।
শেষতঃ, ১৯৬৩ সালের ৩ জুন, মস্কোর এক সকালে থেমে যায় এই বিদ্রোহী কবির হৃদস্পন্দন। কিন্তু রেখে যান তার অমোচনীয় কাব্যচিহ্ন—একটি স্বপ্ন, একটি বিপ্লব, একটি কবিতা… যা আজও মাটির নিচে নয়, মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে।
লেখক এবিএম জাকিরুল হক টিটন। সম্পাদক ও প্রকাশক খবরওয়ালা
মন্তব্য