খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে নতুন করে দেখা দেয় বজ্রপাতের ভয়। আকাশে মেঘ জমলেই উৎকণ্ঠায় থাকেন কৃষক, জেলে ও দিনমজুরেরা। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন খোলা মাঠ, বিল ও হাওরে কাজ করতে গিয়ে জীবনঝুঁকি নিতে হয় তাদের। ফলে প্রতি বছরই এই অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেত্রকোনায় বজ্রপাতে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে জেলায় বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জন। নিহতদের বেশির ভাগই কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা অন্যান্য শ্রমনির্ভর পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব তাদের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
| বছর | মৃত্যুর সংখ্যা |
|---|---|
| ২০২১ | ১৫ |
| ২০২২ | ৩ |
| ২০২৩ | ১২ |
| ২০২৪ | ৫ |
| ২০২৫ | ১২ |
| ২০২৬ (জুন পর্যন্ত) | ১৩ |
| মোট (২০২১-২০২৬ জুন) | ৬০ |
| সবচেয়ে বেশি মৃত্যু | ২০২১ (১৫ জন) |
| সবচেয়ে কম মৃত্যু | ২০২২ (৩ জন) |
| উচ্চ ঝুঁকির উপজেলা | খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও সদর |
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা আবারও এই ঝুঁকির ভয়াবহতা সামনে নিয়ে এসেছে। ১৮ জুন ভোরের বৃষ্টির পর মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়া (২৪) বাড়ির পাশের জমিতে মাছ ধরতে যান। পরিবারের জন্য মাছ নিয়ে ফিরবেন—এমন আশা নিয়েই তিনি বের হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বজ্রপাতের আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
একই দিনে কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারান শামসুল হুদা (৫৫)। একই উপজেলার সান্দিকোনা এলাকায় বজ্রাঘাতে নিহত হন আশরাফুল ইসলাম (২৫)। একদিনে তিনজনের মৃত্যু পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলে। বিশেষ করে পরিবারগুলোর একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে স্বজনরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, হাওরাঞ্চলে কাজ করতে গেলে আবহাওয়ার পরিবর্তন অনেক সময় আগে থেকে বোঝা যায় না। খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক জানান, মাঠে কাজ করার সময় হঠাৎ করেই কালো মেঘ জমে বজ্রপাত শুরু হয়। আশপাশে নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় জীবন হাতে নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হয়। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরাও। তারা বলেন, নৌকায় মাছ ধরার সময় বজ্রপাত শুরু হলে মাঝপথে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানোর সুযোগ খুব কম থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের প্রবণতা বাড়ছে। নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুনের ভাষ্য, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে, যা বজ্রমেঘ সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস (সিবি) মেঘ থেকেই বজ্রপাতের উৎপত্তি হয়। তিনি আরও বলেন, নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে প্রাকৃতিক সুরক্ষাও কমে গেছে। তাই হাওরাঞ্চলে তালগাছসহ উঁচু ও উপযোগী গাছ লাগানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, হাওরের বিশাল এলাকাজুড়ে শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং কৃষক ও জেলেদের জন্য খোলা মাঠ ও হাওরের কাছাকাছি বিশেষ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা শেল্টার জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আকস্মিক দুর্যোগের সময় এসব আশ্রয়কেন্দ্রে দ্রুত আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে এবং স্থান নির্বাচন ও কারিগরি বিষয় পর্যালোচনার জন্য বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। পরিকল্পিত আশ্রয়কেন্দ্রে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার সুবিধাও রাখা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বজ্রপাতে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মতো উন্মুক্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় এসব উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।