নেপাল ও চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট আকস্মিক প্রলয়ঙ্কারী বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে এক মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আজ শনিবার পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৩ জনে। এছাড়া দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকে থাকায় নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯৮০ জনে। বিশাল এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও দুর্গম ভৌগোলিক কন্ডিশন ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এজেন্সির শনিবারের হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, কেবল নেপাল ভূখণ্ডেই অন্তত ৬২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সাথে দেশে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২ হাজার ৪২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির নিখোঁজদের বড় একটি অংশই স্থানীয় অধিবাসী এবং পাহাড়ি পথের ট্রেকার। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, উদ্ধারকাজ চলাকালে এবং নিখোঁজদের তালিকা সমন্বয়ের সময় এই পরিসংখ্যানে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে সীমান্তে অবস্থিত তিব্বত অংশে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বত অংশে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা গেছে। সীমান্ত সংলগ্ন ওই চীনা ভূখণ্ডে নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৫৫ফা জন। এ ছাড়া চীন কর্তৃপক্ষ তাদের সীমানার ভেতর আরও প্রায় ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা জানালেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় বা জাতীয়তা স্পষ্ট করতে পারেনি।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে শুধু স্থানীয় নেপালি ও তিব্বতি অধিবাসীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হননি, বরং নিখোঁজ হয়েছেন বিশাল সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যটক ও বিদেশি কর্মী। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, তাদের দেশে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো সন্ধান মিলছে না। তাদের খোঁজে নেপালের বিভিন্ন পর্যটন এলাকা ও পাহাড়ি ট্রেইলগুলোতে সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দলের অনুসন্ধান অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
নিখোঁজ ও উদ্ধারের বৈশ্বিক পরিস্থিতির তথ্য নিচে টেবিলে তুলে ধরা হলো:
বিভিন্ন দেশের নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া নাগরিকদের তথ্য
┌──────────────────────────────────────┬───────────────────────────────┬──────────────────────────────┐
│ দেশ │ নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা │ উদ্ধার/নিরাপদ মানুষের সংখ্যা │
├──────────────────────────────────────┼───────────────────────────────┼──────────────────────────────┤
│ নেপাল (স্থানীয় ও পর্যটক) │ ২,৪২৬ জন (তন্মধ্যে ৬২২ পর্যটক)│ - │
│ তিব্বত/চীন (চীনা নাগরিক ও অন্যান্য) │ ৫৫৪ জন (সীমান্তে) + ২৬০ বিদেশি │ ১৬ জন উদ্ধার │
│ ভারত │ ৯৮ জন │ ৮৫ জন উদ্ধার │
│ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র │ ৬৫ থেকে ৯০ জন │ ৩ জন উদ্ধার │
│ ইউক্রেন │ ৬১ থেকে ৬২ জন │ - │
│ মালয়েশিয়া │ ৫১ জন │ - │
│ অস্ট্রেলিয়া │ ৪১ জন │ - │
│ যুক্তরাজ্য │ ৩৩ জন │ - │
│ কানাডা │ ২৫ থেকে ৩০ জন │ - │
│ লাটভিয়া │ ২৯ জন │ - │
│ দক্ষিণ কোরিয়া │ ৯ জন (জলবিদ্যুৎ শ্রমিক) │ - │
│ সিঙ্গাপুর │ ৯ জন │ - │
│ রাশিয়া │ ৯ জন │ ২ জন উদ্ধার │
│ জার্মানি │ ৮ জন │ - │
│ দক্ষিণ আফ্রিকা │ ৬ জন │ - │
│ জাপান │ ৫ জন │ - │
│ নিউজিল্যান্ড │ ৫ জন │ - │
│ ফ্রান্স │ ৪ জন │ - │
│ অন্যান্য দেশ (স্পেন, কাজাখস্তান ইত্যাদি)│ ২৮ জন │ ৫ জন উদ্ধার │
└──────────────────────────────────────┴───────────────────────────────┴──────────────────────────────┘
আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কাঠমান্ডুর ইউক্রেনীয় দূতাবাস এবং যুক্ত রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্র দপ্তর স্ব-স্ব দেশের বিপুল সংখ্যক নিখোঁজ নাগরিক নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার ৯ জন নাগরিক, যারা নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন, ঘটনার পর থেকে তাদেরও কোনো খোঁজ মিলছে না।
নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ তালিকায় স্পেনের ৩ জন, পর্তুগালের ৩ জন, হাঙ্গেরির ৩ জন, নেদারল্যান্ডসের ২ জন, আয়ারল্যান্ডের ২ জন ছাড়াও বেলারুশ, ফিনল্যান্ড, ইসরায়েল, লিথুয়ানিয়া, ফিলিপাইন, সার্বিয়া, ভিয়েতনাম ও সুইজারল্যান্ডের ১ জন করে নাগরিক রয়েছেন।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্ত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা এবং কাদা ও পাথরের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে দুই দেশের সামরিক বাহিনী ও উদ্ধারকারী সংস্থা যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।


