খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জুন ২০২৬, ৯:২৭ এএম
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স ল’ইয়ার) নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে সলিসিটর অফিসকে এই নির্দেশনা প্রদান করেন।
গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে আট বছর বয়সী ওই শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ উদ্ধারের পূর্বেই সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আসামি সোহেল রানা শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে ঘটনাস্থল থেকেই তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শিশুটির পিতা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায়, ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার উভয়কেই মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকর করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা আইনি পরিভাষায় ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে পরিচিত। ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর আইনগত প্রক্রিয়া মেনে যাবতীয় নথিপত্র হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পাঠানো হয় এবং এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নম্বরভুক্ত হয়।
অন্যদিকে, দণ্ডিত আসামিরাও কারাকর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এই রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক জেল আপিল দায়ের করেন। হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই জেল আপিল দুটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। সাধারণত ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিল বা আবেদনসমূহের ওপর একসঙ্গেই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে মামলার যাবতীয় বৃত্তান্ত সম্বলিত ‘পেপারবুক’ তৈরি করা আবশ্যক, যা ইতিমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
পল্লবীর এই আলোচিত মামলার ঘটনাপ্রবাহ, বিচারিক আদালতের রায় এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিবরণ নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| তারিখ | ঘটনা ও আইনি প্রক্রিয়ার বিবরণ |
| ১৯ মে | পল্লবীর ফ্ল্যাট থেকে শিশুর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার, স্ত্রী স্বপ্না আটক এবং সন্ধ্যায় ফতুল্লা থেকে মূল আসামি সোহেল রানা গ্রেপ্তার। |
| ৭ জুন | ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় ঘোষণা। |
| ৯ জুন | মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য যাবতীয় নথিপত্র হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় প্রেরণ ও নম্বরভুক্তকরণ। |
| ১০ জুন | প্রধান বিচারপতি কর্তৃক নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন। |
| ১১ জুন | কারাকর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আসামিদের পক্ষ থেকে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক জেল আপিল দায়ের। |
| ১৪ জুন | বিশেষ দ্বৈত বেঞ্চের বিচারিক কার্যক্রম শুরু এবং অপর একটি বেঞ্চে আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ। |
| ১৬ জুন (মঙ্গলবার) | হাইকোর্টের অগ্রাধিকার বেঞ্চের কার্যতালিকায় ১ নম্বর ক্রমিকে ডেথ রেফারেন্স উত্থাপন এবং আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের নির্দেশ। |
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয়াদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি একটি সুনির্দিষ্ট বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত এই দ্বৈত বেঞ্চের দৈনিক কার্যতালিকায় পল্লবীর এই মামলাটি আদেশের জন্য ১ নম্বর ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক ও সৈয়দ ইজাজ কবির। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, মামলার পেপারবুক ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে। আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরপরই আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি হাইকোর্টে চূড়ান্ত শুনানির জন্য প্রস্তুত হবে।
মন্তব্য