পাকিস্তানের স্কুল ক্রিকেটে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে আলোচনায় উঠে এসেছেন ১৭ বছর বয়সী এক তরুণ। তাঁর নাম অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। নামটি শুনলে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কিংবদন্তি উইকেটকিপার-ব্যাটার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের কথা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তবে নামের মিলের বাইরেও নিজের ব্যাটিং দক্ষতা দিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কেড়েছেন পাকিস্তানের এই কিশোর।
হ্যাপি প্যালেস গ্রামার স্কুলের বিপক্ষে কামরান পাবলিক স্কুলের হয়ে খেলতে নেমে মাত্র ১০৮ বলে ১১৭ রানের ঝলমলে ইনিংস উপহার দেন তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল আক্রমণাত্মক মানসিকতা ও বড় সংগ্রহ গড়ে তোলার সামর্থ্যের পরিচয়। এই ইনিংসের সুবাদে নির্ধারিত ৪০ ওভারে ২৯৭ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায় কামরান পাবলিক স্কুল। পরে প্রতিপক্ষকে মাত্র ১৭২ রানের ব্যবধানে হারিয়ে ম্যাচটি নিজেদের করে নেয় দলটি।
স্কুল পর্যায়ের ক্রিকেটে এমন ইনিংস একজন তরুণ খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁর প্রতিভা তুলে ধরারও বড় সুযোগ। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার দক্ষতা, দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকার ক্ষমতা এবং দলের জন্য বড় সংগ্রহ গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য একজন ব্যাটারের সম্ভাবনা বুঝতে সাহায্য করে। অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ১১৭ রানের ইনিংসও সেই বিবেচনায় তাৎপর্যপূর্ণ। তবে একটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নামের পেছনে রয়েছে মজার গল্প
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সঙ্গে পাকিস্তানের এই তরুণের নামের মিল নিছক কাকতালীয় নয়। এর পেছনে রয়েছে তাঁর পরিবারের ক্রিকেটপ্রেমের গল্প।
তরুণ ক্রিকেটারের ‘অ্যাডাম’ নামটি রেখেছিলেন তাঁর মা। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সমর্থক এবং ক্রিকেটের প্রতি গভীর অনুরাগী তাঁর বাবা নামের সঙ্গে যুক্ত করেন ‘গিলক্রিস্ট’ অংশটি। এভাবেই পরিচিত ক্রিকেট তারকার নামের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করা হয় তাঁর।
নামের এই বিশেষত্বের কারণে তিনি শুরু থেকেই অন্যদের আগ্রহের কারণ হতে পারেন। তবে সাম্প্রতিক সেঞ্চুরি তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ক্রিকেটে পরিচিত কোনো তারকার নাম বহন করা এক বিষয়, আর মাঠে নিজের দক্ষতা দিয়ে পরিচিতি তৈরি করা সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যাট হাতে ১১৭ রানের ইনিংস খেলে দ্বিতীয় কাজটিতেই নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন পাকিস্তানের এই কিশোর।
খেলার ধরনেও আছে মিল
নামের পাশাপাশি খেলার ধরনেও অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সঙ্গে কিছু মিল রয়েছে পাকিস্তানের এই তরুণের। তিনিও বাঁহাতি উইকেটকিপার-ব্যাটার এবং সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ইনিংসের সূচনা করেন।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা গিলক্রিস্ট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ওপেনার হিসেবে দ্রুত রান তুলে প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ের এই ধরন একসময় আধুনিক সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ওপেনারদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করেছিল।
পাকিস্তানের স্কুল ক্রিকেটে উঠে আসা তরুণটির ক্ষেত্রেও বাঁহাতি ব্যাটিং ও ওপেনিংয়ের দায়িত্ব পালনের মিলটি আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে দুই ক্রিকেটারের মধ্যে এই সাদৃশ্য থাকলেও তাঁদের অর্জন ও অভিজ্ঞতার তুলনা করার সময় এখনো আসেনি। পাকিস্তানের এই কিশোরের সামনে রয়েছে দীর্ঘ পথ। নিয়মিত ভালো খেলা, কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করা এবং বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পরবর্তী ধাপে জায়গা করে নেওয়াই হবে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাঙ্গাকারাকে
নামের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তির মিল থাকলেও নিজের ক্রিকেটীয় আদর্শ হিসেবে অন্য একজন কিংবদন্তিকে বেছে নিয়েছেন তরুণ অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। সেঞ্চুরির পর নিজের প্রিয় ক্রিকেটারের নাম জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কুমার সাঙ্গাকারার মতো হতে চাই। তিনিই আমার প্রিয়।’
শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিং দক্ষতা, ধারাবাহিকতা এবং উইকেটকিপার হিসেবে অবদানের জন্য সুপরিচিত। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের সঙ্গে খেলা এই বাঁহাতি ব্যাটার ক্রিকেটের বিভিন্ন সংস্করণে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ফলে তাঁর মতো একজন ক্রিকেটারকে আদর্শ হিসেবে বেছে নেওয়া তরুণ গিলক্রিস্টের ব্যক্তিগত পছন্দের পরিচয় দেয়।
ক্রিকেটে একজন আদর্শ খেলোয়াড় তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারেন। তবে সেই অনুপ্রেরণাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন অনুশীলন, শৃঙ্খলা, ধারাবাহিকতা এবং প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করার মানসিকতা। স্কুল ক্রিকেটে পাওয়া এই সাফল্য গিলক্রিস্টের জন্য সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
বড় পরিসরে প্রতিভা খুঁজছে পাকিস্তান ক্রিকেট
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) আয়োজনে চলমান স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতাটি দেশটির তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটের বিকাশের একটি বড় উদ্যোগ। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে পাকিস্তানের ১০০ জেলার ১ হাজার ৪২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২১ হাজার ক্রিকেটার।
এত বড় পরিসরে প্রতিযোগিতার আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু স্কুল পর্যায়ে খেলা চালু রাখা নয়; বরং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের সামনে আসার সুযোগ তৈরি করা। অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের জন্য নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া সহজ হয় না। সংগঠিত স্কুল ক্রিকেট সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
এ ধরনের প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়েরা নিজেদের ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ পান। একই সঙ্গে দলগত সমন্বয়, চাপ সামলানো এবং প্রতিপক্ষের কৌশল বুঝে খেলার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন তাঁরা। ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারলে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার পথও তৈরি হতে পারে।
অবশ্য স্কুল ক্রিকেটে ভালো করা মানেই জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া নয়। প্রতিভার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের প্রয়োজন হয়। তাই তরুণ ক্রিকেটারদের সম্ভাবনা বিকাশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
কামরান পাবলিক স্কুলের হয়ে ১০৮ বলে ১১৭ রান করে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট আপাতত নিজের প্রতিভার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। তাঁর নাম তাঁকে বাড়তি পরিচিতি দিয়েছে, আর ব্যাটিং তাঁকে আলোচনায় এনেছে। এখন দেখার বিষয়, এই সাফল্যকে পুঁজি করে তিনি কতটা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে পারেন এবং পাকিস্তানের ক্রিকেটে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে পারেন কি না।


