পাকিস্তানে ঐতিহাসিক রামলীলা মন্দির সিলগালা, নির্মাণকাজ বন্ধ

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের ডেরা ইসমাইল খান শহরের রহিম বাজারে অবস্থিত ঐতিহাসিক রামলীলা মন্দির সিলগালা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পুরোনো এই স্থাপনা ভেঙে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পর নাগরিক সমাজ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে কর্তৃপক্ষ এ পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে।

ডন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঐতিহ্যবাহী মন্দির ভবনটি ভেঙে নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নাগরিক সমাজের কর্মীরা সেখানে হস্তক্ষেপ করেন। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষার দাবিতে প্রতিবাদ শুরু হলে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। পরে সহকারী কমিশনার হামিদ সিদ্দিক ভবনটি সিলগালা করেন এবং সেখানে নির্মাণকাজ বন্ধের ব্যবস্থা নেন।

মন্দিরটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনাটি একবার ধ্বংস করা হলে তার মূল স্থাপত্য ও অতীতের স্মারক আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। এ কারণে ভবনটির মালিকানা, সংরক্ষণের দায়িত্ব এবং সেখানে নতুন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার বৈধতা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

মন্দিরটি রক্ষার দাবিতে পরবর্তী সময়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা একটি বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে প্রস্তাবিত নির্মাণকাজের নিন্দা জানানো হয়। পাশাপাশি বিষয়টি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে উত্থাপনের জন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান অংশগ্রহণকারীরা। তাঁদের মতে, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের বিষয়টি শুধু স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব রয়েছে।

নাগরিক সমাজের সভাপতি সোহেল আহমেদ আজমির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি কিশোর কুমার, সমাজকর্মী মুহাম্মদ নওমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা মন্দিরটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগের পেছনের কারণ অনুসন্ধান এবং ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা জানান, ডেরা ইসমাইল খান শহরের প্রায় ৪০০টি ভবনকে উচ্ছেদকৃত সম্পত্তি ট্রাস্ট বোর্ডের (ইটিপিবি) পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। তাই রামলীলা মন্দির ভেঙে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তাঁরা।

বৈঠকে আরও অভিযোগ করা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ওই স্থানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভূমিকা এবং ভবনটির সংরক্ষণ-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানান তাঁরা।

এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। জেলা প্রশাসন, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে নির্মাণকাজের অনুমোদন-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি হবে এবং মন্দিরটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ

রামলীলা মন্দিরকে ঘিরে এই ঘটনা পাকিস্তানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে। পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনাগুলো কেবল উপাসনার স্থান নয়; এগুলো কোনো এলাকার সামাজিক ইতিহাস, স্থাপত্যরীতি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অতীতের সঙ্গে সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে। ফলে এ ধরনের ভবন ভাঙা বা নতুন কাজে ব্যবহারের আগে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সংরক্ষণযোগ্যতা এবং প্রযোজ্য আইন যাচাই করা জরুরি।

তবে মন্দিরটির সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল, ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, মালিকানার অবস্থা এবং ভবনটি সংরক্ষণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী আইনি ব্যবস্থা প্রযোজ্য, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। একইভাবে, নির্মাণের অনুমোদন কে দিয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এসেছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।

এ মুহূর্তে মন্দিরটি সিলগালা করে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তই পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক পরিবর্তন। এখন তদন্তের মাধ্যমে ভবনটির আইনগত অবস্থান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণ, অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি এবং সংরক্ষণ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সেদিকেই নজর রাখছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।