খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৪৮ পিএম
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিনব কৌশলে এক নবজাতক চুরির ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। পেটে ও কোমরে কাপড় বেঁধে নিজেকে প্রসূতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে এক নারী শিশুটিকে কোলে নেওয়ার সুযোগ নেন। পরে স্বামীর সহায়তায় শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন ও নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতায় তারা ধরা পড়েন। এ সময় নবজাতকটিকেও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আটক দম্পতিকে পরে গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। তারা হলেন উপজেলার ফাঁসিতলা গ্রামের মৃত ভোলা মিয়ার ছেলে সিরাজুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী শিফালী বেগম।
নবজাতকের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের সমসপাড়া গ্রামের জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুপালী বেগম সন্তান প্রসবের জন্য সোমবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের পর মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় শিশুটিকে কোলে নিয়ে দেখাশোনা করছিলেন তার দাদি জয়গুন বেওয়া।
এ সময় পাশের একটি বেডে থাকা শিফালী বেগম নিজেকে প্রসূতি হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি শিশুটিকে কোলে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে জয়গুন বেওয়া কোনো সন্দেহ না করে তার হাতে নবজাতককে তুলে দেন। কিছুক্ষণ শিশুটিকে কোলে রাখার পর শিফালী সুযোগ বুঝে তার স্বামী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে হাসপাতালের নিচে নেমে যান। তারা শিশুটিকে নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
কিছুক্ষণ পর জয়গুন বেওয়া শিশুটিকে আর দেখতে না পেয়ে বিষয়টি বুঝতে পারেন। তিনি চিৎকার শুরু করলে হাসপাতালের আশপাশে থাকা লোকজন ও নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তারা হাসপাতালের নিচে নেমে অভিযুক্ত দম্পতিকে ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে শিশুসহ শিফালী বেগম ও সিরাজুল ইসলামকে আটক করা হয়।
তবে স্থানীয়দের ধাওয়ার মুখে তাদের সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন ব্যক্তি পালিয়ে যায় বলে স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে। এতে ঘটনাটি শুধু ওই দম্পতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না—তা নিয়েও তদন্তের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা একটি শিশু পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশ জানতে পারে। একই সঙ্গে শিফালী বেগম কীভাবে নিজেকে প্রসূতি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, তারও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসে। তাকে প্রসূতি মনে করানোর জন্য পেট ও কোমরের চারপাশে কাপড় পেঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। দূর থেকে দেখলে বিষয়টি স্বাভাবিক প্রসূতির মতো মনে হওয়ার মতো করেই এই ছদ্মবেশ তৈরি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও ঘটনাটি হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রসূতি ও নবজাতকের ওয়ার্ডে বহিরাগতদের চলাচল, রোগীর স্বজনদের পরিচয় যাচাই এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে সদ্যজাত শিশুকে অপরিচিত কারও হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে নবজাতকের মায়ের চাচাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় নবজাতক চুরি ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বপন কুমার জানান, আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আটক স্বামী-স্ত্রীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চালানো হবে বলেও তিনি জানান।
এ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া নবজাতক বর্তমানে পরিবারের কাছে রয়েছে। তবে শিশু চুরির পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল কি না এবং থাকলে তাদের সঙ্গে আটক দম্পতির সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
মন্তব্য