ফতুল্লায় ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলীতে ইটভাটা, মাটি ও শ্রমিক সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধ ও টেঁটাবিদ্ধসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাস্থল থেকে ৪০টি টেঁটা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে।

শুক্রবার (১০ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের আকবরনগর সিপাহীবাড়ি এলাকায় কয়েক দফায় এ সংঘর্ষ হয়। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের বিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অতিথি নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনাও সংঘর্ষের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। দুই পক্ষের লোকজন সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্র ও টেঁটা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আহত ব্যক্তিদের মধ্যে হাজী সামেদ আলীর ছোট ছেলে হৃদয় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আলাউদ্দিন শেখের ছেলে রাজু শেখ টেঁটাবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া সিয়াম, অলি ও মুজাব্বির নামে আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে আহতদের সবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইটভাটা ও সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম আজাদের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা অটোরিকশা ও অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক আব্দুল কাদির সিপাই এবং হাজী সামেদ আলীর পক্ষের লোকজনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।

স্থানীয়দের দাবি, ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ, মাটি ও শ্রমিক সরবরাহ এবং এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কমিশন আদায়ের বিষয় নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। এসব কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরে বিরোধটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক উত্তেজনার সঙ্গে মিশে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

বক্তাবলীতে কৃষক দলের একটি আলোচনা সভায় মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোক্তার হোসেনকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সেই উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় শুক্রবার বিকেলে সিপাহীবাড়ি এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকেল ৩টার দিকে হালিম আজাদের পক্ষের লোকজন সিপাহীবাড়ি এলাকার কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও গুলিবর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে কাদির সিপাই ও সামেদ আলীর পক্ষের লোকজনের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

তবে সংঘর্ষের সূচনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। ফলে কারা প্রথম হামলা চালিয়েছেন, তা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আলামত ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

চাঁদা দাবি ও বাড়িতে লুটপাটের অভিযোগ

আব্দুল কাদির সিপাই সংবাদমাধ্যম এশিয়া পোস্টকে বলেন, হালিম আজাদ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় শুক্রবার কেরানীগঞ্জ থেকে লোকজন এনে তাঁর বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

কাদির সিপাইয়ের দাবি, হামলাকারীরা বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজ, কাপড় ধোয়ার যন্ত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে গেছেন। হামলার সময় কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোড়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় তাঁদের পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। বাড়ি থেকে কী পরিমাণ মালামাল খোয়া গেছে, লুটপাটের অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের আলামত রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।

অভিযোগ অস্বীকার হালিম আজাদের

অন্যদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হালিম আজাদ। তিনি বলেন, কৃষক দলের একটি কর্মসূচি শেষে মিছিল নিয়ে ফেরার পথে সামেদ আলী ও কাদির সিপাইয়ের লোকজন তাঁদের ওপর হামলা করেন। এতে তাঁদের পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

হালিম আজাদের ভাষ্য, তিনি নিজে গুলি চালাননি; বরং ঘটনাস্থলে সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করেছেন। কাদির সিপাইয়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্ব নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি করা কিংবা বিএনপির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও সঠিক নয় বলে জানান এই নেতা।

দুই পক্ষের বক্তব্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত, হামলাকারীদের পরিচয় এবং বিরোধের প্রকৃত কারণ নিয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। এক পক্ষ যেখানে চাঁদা দাবি ও বাড়িতে হামলার অভিযোগ তুলেছে, অন্য পক্ষ সেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে হামলার শিকার হওয়ার দাবি করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঘটনাস্থল থেকে ৪০টি টেঁটা উদ্ধার

সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থল থেকে ৪০টি টেঁটা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে। তবে তাঁদের পরিচয়, সংঘর্ষে সংশ্লিষ্টতার ধরন কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

এ ধরনের সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ স্থানীয় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। বিশেষ করে বসতবাড়িতে হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং সম্পদের সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।

বক্তাবলীর ঘটনাটি শুধু দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ইটভাটা, মাটি ও শ্রমিক সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও জড়িত। এসব বিরোধের নিষ্পত্তি আইনসম্মতভাবে না হলে তা নতুন করে সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এখন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ যাচাই এবং অস্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে দুই পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে দায়ী না করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াই হবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উপযুক্ত পথ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।