২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব। ম্যাচের ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জনও সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ক্রিস্তিয়ান ‘কুতি’ রোমেরো। তাঁর মতে, ফাইনালে সন্দেহজনক কিছু ঘটেনি; বরং স্পেন নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়েই শিরোপা জয়ের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসের এক প্রতিবেদনে রোমেরোর বক্তব্য প্রকাশিত হয়।
ফাইনাল ঘিরে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন সম্পর্কে রোমেরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ভিত্তিহীন মন্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ অযৌক্তিক কিছু লিখলেও মুহূর্তের মধ্যে তা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তাই অনলাইনে প্রচারিত সব বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি।
আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রোমেরো স্বীকার করেন, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই দলকে শারীরিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কয়েকজন খেলোয়াড়ের পক্ষে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ফিটনেস ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাঁর নিজের অবস্থাও ভালো ছিল না।
চোটের কারণে কঠিন সময় পার করেছে আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপজুড়ে দলের একাধিক খেলোয়াড় চোটের সমস্যায় ভুগেছেন বলে জানান রোমেরো। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লিয়ান্দ্রো পারেদেস পাঁজরের চোট নিয়ে খেলেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর টেন্ডনের সমস্যার কারণে নিজেও অনুশীলন করতে পারেননি তিনি।
লিসান্দ্রো মার্তিনেস, যিনি ‘লিচা’ নামে পরিচিত, এবং মলিনারও শারীরিক সমস্যা ছিল বলে জানান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। নিকোলাস তাগলিয়াফিকো পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। অন্যদিকে, গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেস ভাঙা আঙুল নিয়ে খেলেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের খেলোয়াড়েরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই করেছেন বলে মনে করেন রোমেরো। তাঁর মতে, শুধু ফাইনালের ফলাফল দেখে পুরো টুর্নামেন্টে দলের প্রচেষ্টা ও শারীরিক সংগ্রামকে মূল্যায়ন করা উচিত নয়।
নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, অন্যরা কী বলছেন, তা নিয়ে তাঁর খুব একটা মাথাব্যথা নেই। যতক্ষণ নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন এবং ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত সর্বস্ব দিয়ে খেলছেন, ততক্ষণ তিনি সন্তুষ্ট।
রোমেরোর ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী বলছেন, তা তাঁর কাছে মুখ্য নয়। নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকা এবং দলের জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়াই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কনটেন্ট তৈরির জন্য সমালোচনা, ক্ষুব্ধ রোমেরো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে খেলোয়াড়দের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন—এমন ব্যক্তিদেরও সমালোচনা করেছেন রোমেরো। তাঁর মতে, কেউ কেউ আলোচনায় থাকার জন্য খেলোয়াড়দের সম্পর্কে খারাপ কথা বলেন এবং সেগুলোকে অনলাইন কনটেন্ট তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।
জাতীয় দলের সঙ্গে গত ছয় থেকে সাত বছর থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রোমেরো বলেন, এই সময়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা সবসময় নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই বাইরের সমালোচনার চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্স ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন তাঁরা।
রোমেরোর বক্তব্যে বোঝা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ককে তিনি মাঠের বাস্তবতার বিকল্প হিসেবে দেখতে চান না। তাঁর কাছে একজন খেলোয়াড়ের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত মাঠে তাঁর পারফরম্যান্স, পরিশ্রম এবং দলের জন্য অবদানের ভিত্তিতে।
বিশ্বকাপের আগে চোট পেয়ে কেঁদেছিলেন রোমেরো
বিশ্বকাপ শুরুর আগে হাঁটুর চোট নিয়ে রোমেরোকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। আঘাত পাওয়ার পর টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কায় তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন বলে জানিয়েছেন এই ডিফেন্ডার।
রোমেরো বলেন, হাঁটুতে চোট পাওয়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল, বিশ্বকাপে আর খেলা সম্ভব হবে না। প্রথমদিকে আঘাতটি আরও গুরুতর বলে মনে হয়েছিল তাঁর কাছে। তবে দুই দিন পর স্ক্যান করানোর পর চোটের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পান তিনি। লিগামেন্টের সমস্যা ধরা পড়ার পর পরিস্থিতি বিবেচনায় শেষ ষোলো কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালের মধ্যে ফিট হয়ে ওঠার আশা করেছিলেন।
এই কঠিন সময়ে তাঁকে দলে রাখার জন্য কোচ লিওনেল স্কালোনির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রোমেরো। তাঁর মতে, অন্য কোনো কোচ হলে হয়তো চোটের কারণে তাঁকে শুরুতেই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। কিন্তু স্কালোনি তাঁর ওপর আস্থা রেখেছিলেন।
রোমেরোর কাছে কোচের সেই বিশ্বাস ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। বড় টুর্নামেন্টের আগে চোটের কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা একজন খেলোয়াড়ের জন্য কোচের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মেসিকে সর্বকালের সেরা মানেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক
জাতীয় দলে লিওনেল মেসির সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কথাও জানিয়েছেন রোমেরো। মেসির বিদায়ের পর তাঁর সঙ্গে আর কথা হয়নি বলে জানান তিনি। জাতীয় দলে একসঙ্গে থাকার সময় তাঁদের মধ্যে নিয়মিত কথা হতো। সেই পরিচিত সম্পর্কের পরিবর্তন এখনো কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয় তাঁর কাছে।
মেসির প্রতি নিজের শ্রদ্ধা প্রকাশের পাশাপাশি ব্যালন ডি’অর ও সুপার ব্যালন ডি’অর নিয়েও মন্তব্য করেন রোমেরো। তাঁর মতে, বর্তমানে ব্যক্তিগত পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বিপণন ও জনপ্রিয়তার প্রভাবও রয়েছে।
রসিকতার সুরে তিনি বলেন, এখন হয়তো ইনস্টাগ্রামে যার অনুসারী বেশি, পুরস্কারটিও তাঁর পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে মেসির দক্ষতা বোঝার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা পরিমাপ করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন রোমেরো।
তাঁর মতে, গ্যালারিতে বসে মেসির একটি ম্যাচ দেখলেই বোঝা যায়, তিনি অন্যদের চেয়ে কতটা আলাদা। মাঠে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং ম্যাচের গতিপথে প্রভাব বিস্তারের দক্ষতাই তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
রোমেরো আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা বিশ্বকাপ জিতলেই কোনো খেলোয়াড় ব্যক্তিগত পুরস্কারের সবচেয়ে বড় দাবিদার হয়ে ওঠেন—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু দলীয় শিরোপা জয়ের পাশাপাশি একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, ধারাবাহিকতা এবং মাঠে তাঁর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
মেসি মাঠে যে ধরনের প্রভাব তৈরি করেন, অন্য কোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে তিনি তেমন কিছু দেখেননি বলে জানান রোমেরো। এ কারণেই আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করেন তিনি।
মেসিকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে এই পুরস্কার দেওয়ার সুযোগ থাকলে কাকে বেছে নিতেন—এমন প্রশ্নের জবাবেও নিজের অবস্থান বদলাননি আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। তাঁর সরাসরি উত্তর, তিনি মেসিকেই পুরস্কারটি দিতেন।
বিশ্বকাপ ফাইনালের ফল নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রোমেরোর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি আর্জেন্টিনার হারকে কোনো ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে দেখছেন না। বরং স্পেনের জয়কে স্বীকার করার পাশাপাশি নিজের দলের শারীরিক প্রতিকূলতা ও লড়াইয়ের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে মেসির প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা এবং কোচ স্কালোনির প্রতি কৃতজ্ঞতাও উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।


