খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ৩:১২ পিএম
রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। উপজেলার সাত ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। দিনে-রাতের দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে গরমে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, জাতীয় গ্রিড থেকে বাঘার চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন ফিডারে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বাঘা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামান জানান, বাঘা ও আড়ানী পৌরসভাসহ উপজেলার সাত ইউনিয়নে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু রাতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ১০ মেগাওয়াট এবং দিনে মাত্র ৭ দশমিক ১ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহ কম থাকায় একসঙ্গে সব এলাকায় বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই একটি লাইন চালু রেখে অন্য লাইন বন্ধ করে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংকট পুরোপুরি কাটানো কঠিন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঘা সদর ও পৌরসভাকেন্দ্রিক এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক কম। বিপরীতে ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রামগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কখন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে অনেক সময় নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ এলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার, রান্নাবান্না, পড়াশোনা ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
গরমের সময় দীর্ঘ লোডশেডিং মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং বিদ্যুৎনির্ভর পরিবারের সদস্যদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বাঘার গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সেচব্যবস্থায়। বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে জমিতে পানি দেওয়া কৃষকদের বিদ্যুৎ আসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চকরাজাপুর ইউনিয়নের কৃষক মহাসিন আলী বলেন, বিদ্যুৎ কখন আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মোটর চালানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব না হলে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
কৃষকদের ভাষ্য, সেচের সময়সূচি ঠিক রাখা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কৃষক বৈদ্যুতিক সেচপাম্পের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিদ্যুৎ সংকটে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর দোকান, ক্ষুদ্র কারখানা ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় রাইস মিল চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ—দুইয়েরই ক্ষতি হচ্ছে।
খামার মালিকেরাও সমস্যায় পড়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে মুরগির খামারে পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা ব্যবহার করে কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছেন। তবে এতে অতিরিক্ত জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় যোগ হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও করছেন স্থানীয় গ্রাহকেরা। কয়েকজন গ্রাহকের দাবি, আগের তুলনায় তাদের বিল প্রায় দ্বিগুণ এসেছে। অথচ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগই নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না।
একজন গ্রাহকের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ যখন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তখন বিল বাড়ছে কেন—এর ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিষ্কারভাবে পাওয়া দরকার।
তবে কোনো নির্দিষ্ট গ্রাহকের বিল কেন বেড়েছে, তা বিলের হিসাব ও মিটার ব্যবহারের তথ্য যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো পৃথকভাবে যাচাই করে প্রয়োজন হলে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বাঘার বাসিন্দাদের আরেকটি অভিযোগ হলো, একই জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রায় বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। রাজশাহী শহরের একজন বাসিন্দার ভাষ্য, তার এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ প্রায় এক ঘণ্টা এবং রাতে প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
এর বিপরীতে বাঘার ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক গ্রামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে ভারসাম্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সরবরাহ ঘাটতি থাকলে লোডশেডিং পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু সংকটের সময়ে সুষম ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থাপনা থাকলে মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমানো সম্ভব।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুৎ এখন শুধু আলো জ্বালানো বা গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানোর বিষয় নয়। কৃষির সেচ, ব্যবসা, ক্ষুদ্র শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির নানা কর্মকাণ্ড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এর প্রভাব কেবল একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় অর্থনীতিতেও তার চাপ পড়ে।
বাঘার সাত ইউনিয়নের বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি দ্রুত কমানোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা শহর ও গ্রামের মধ্যে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা, লোডশেডিংয়ের সময়সূচি সম্পর্কে গ্রাহকদের আগাম জানানো এবং বাড়তি বিলের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মূল সংকটের কারণ জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া। তাই সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিই বাঘার দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং কমানোর প্রধান শর্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য