খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায় একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মধ্যে সংগঠিত এই সহিংসতায় বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং চারজন পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করতে হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই বিরোধের সূত্রপাত উপজেলার ৭ নম্বর বড়ইউড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদকে কেন্দ্র করে। উক্ত ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন হামলার ঘটনা ঘটে। এ সংক্রান্ত একাধিক মামলায় আসামি হিসেবে ফরিদ উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান।
ফরিদ উদ্দিন কারাগারে যাওয়ার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাঁকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তাঁর অনুপস্থিতিতে স্থানীয় সরকার বিধিমালা অনুযায়ী ইউপি সদস্য কফিল উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সম্প্রতি ফরিদ উদ্দিন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি লাভ করেন এবং তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি তাঁর চেয়ারম্যান পদ পুনর্বহাল করতে সক্ষম হন।
সোমবার (৮ জুন) পুনর্বহাল আদেশের পর ফরিদ উদ্দিন ইউনিয়ন পরিষদে নিজের দায়িত্বভার পুনরায় গ্রহণ করতে যান। এ সময় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিনের সাথে তাঁর তীব্র বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিষদের বাইরে উভয় নেতার সমর্থক এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতিশীল রূপ ধারণ করে এবং গ্রামবাসী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। উভয় পক্ষই টেঁটা, লাঠিসোঁটাসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করে।
দুপুর ১২টার দিকে উভয় পক্ষ সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। উপজেলার বড়ইউড়ি গ্রামে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে। খবর পেয়ে বানিয়াচং থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। পুলিশ দীর্ঘ চেষ্টার পর বেলা সোয়া ২টার দিকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
সংঘর্ষের তীব্রতা এবং তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের গৃহীত পদক্ষেপের একটি পরিসংখ্যানগত বিবরণ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিবরণের খাত | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| সংঘর্ষের স্থান | বড়ইউড়ি গ্রাম, ৭নং বড়ইউড়ি ইউনিয়ন, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ |
| সংঘর্ষের সময়কাল | সোমবার (৮ জুন), দুপুর ১২:০০টা থেকে বেলা ২:১৫ মিনিট (প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট) |
| মোট আহতের সংখ্যা | ওসিসহ অর্ধশতাধিক (৫০ জনের বেশি) ব্যক্তি |
| আহত পুলিশ সদস্য | ওসিসহ মোট ৪ জন পুলিশ সদস্য |
| ব্যবহৃত টিয়ারশেল | ৩ রাউন্ড |
| ব্যবহৃত সাউন্ড গ্রেনেড | ৪ রাউন্ড |
| চিকিৎসা কেন্দ্রসমূহ | বানিয়াচং ও হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল |
এই সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গুরুতর ও সাধারণ আহতদের সেখানে ভর্তি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ নাজমুল হক জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ৩ রাউন্ড টিয়ারশেল এবং ৪ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হয়েছে। সংঘর্ষের সময় তিনি নিজে এবং আরও তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, তবে তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
ওসি আরও উল্লেখ করেন যে, পুলিশের তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে বেলা সোয়া ২টার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। বর্তমানে বড়ইউড়ি গ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে পুনরায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ও নতুন করে উত্তেজনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এই সহিংসতার ঘটনায় জড়িত ও আইনভঙ্গকারীদের চিহ্নিত করে আটক করার জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে থানা প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।