ক্রিকেটে ফর্মহীনতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশ্বমানের ব্যাটসম্যানদেরও ক্যারিয়ারের কোনো না কোনো পর্যায়ে রানখরার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট হাতে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে তা কেবল পরিসংখ্যানের ওপর প্রভাব ফেলে না, একজন ক্রিকেটারের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক অবস্থাকেও নড়বড়ে করে দেয়। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা ব্যাটসম্যান বাবর আজম এখন তেমনই এক কঠিন সময় পার করছেন। তাঁর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিক ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে পাকিস্তানের ক্রিকেটমহলে। এমন পরিস্থিতিতে বাবরের সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্যতিক্রমী এক পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফ। তাঁর মতে, আপাতত ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যস্ত না রেখে বাবরকে ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়ার কোনো বিশেষায়িত ক্রিকেট একাডেমিতে পাঠানো উচিত।
নিজের মাঠে সদ্য শেষ হওয়া ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে বাবরের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। পাঁচ ম্যাচে মাত্র ১১৮ রান করেছেন তিনি। ব্যাটিং গড় ২৩.৬০ এবং স্ট্রাইক রেট ৭৪.২১। পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ৪৫ রান, যা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রাথমিক পর্বের প্রথম ম্যাচে এসেছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাঁচ ম্যাচের কোনোটিতেই অর্ধশতকের দেখা পাননি পাকিস্তানের এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।
ফাইনালেও ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হতে পারেননি বাবর। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরতে হয়েছে তাঁকে। অফ স্টাম্পের বাইরের একটি বল অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাড়া করতে গিয়ে চতুর্থ স্লিপে ক্যাচ তুলে দেন। এমন আউট তাঁর সাম্প্রতিক ব্যাটিং সমস্যার পাশাপাশি শট নির্বাচনের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
যদিও বাবরের ব্যর্থতার মধ্যেও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত শিরোপা জয়ের আনন্দে মেতেছে। ফাইনালে ফাখর জামানের দুর্দান্ত শতকের পাশাপাশি সাদ বেগ ও আরাফাত মিনহাসের পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংসের সুবাদে ৩২৬ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায় পাকিস্তান। তিন উইকেটের জয় নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করে স্বাগতিকেরা। তবে দলের এই সাফল্য বাবরের ব্যক্তিগত ব্যাটিং সংকটকে আড়াল করতে পারেনি।
এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন মোহাম্মদ ইউসুফ। রোববার দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বাবরের টেকনিক্যাল সমস্যাগুলো বিশেষায়িত কোচিংয়ের মাধ্যমে সমাধান না করা পর্যন্ত তাঁর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অংশ নেওয়া উচিত নয়। ইউসুফের আশঙ্কা, বর্তমান অবস্থায় ঘরোয়া ক্রিকেটে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হলে বাবরের আত্মবিশ্বাস আরও কমে যেতে পারে। এতে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাবরের জন্য বিকল্প প্রস্তুতির জায়গা হিসেবে ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট একাডেমির কথা উল্লেখ করেছেন ইউসুফ। তাঁর বিশ্বাস, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং অভিজ্ঞ ব্যাটিং কোচের নিবিড় তত্ত্বাবধানে বাবরের টেকনিক্যাল দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব।
নিজের পোস্টে ইউসুফ লিখেছেন, বাবর এখনো পাকিস্তানের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সামান্য প্রচেষ্টা পেলে তিনি আবারও নিজের সেরা অবস্থানে ফিরে আসতে পারবেন। একই সঙ্গে চার বছর আগে একই ধরনের পরামর্শ দিয়েও গুরুত্ব না পাওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন সাবেক এই অধিনায়ক। এবার যেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর কথায় গুরুত্ব দেন, সেই আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
তবে ইউসুফের পরামর্শের বিপরীতে বাবরের সামনে এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার বাস্তব প্রস্তুতি রয়েছে। আসন্ন কায়েদ-ই-আজম ট্রফির জন্য লাহোর হোয়াইটস দলে জায়গা পেয়েছেন ৩২ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান। আগামী ৩ নভেম্বর ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া টুর্নামেন্টে তাঁর দল মুখোমুখি হবে শাহিন শাহ আফ্রিদির নেতৃত্বাধীন এফএটিএ দলের।
ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাবরের অংশগ্রহণ নিয়ে তাই নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে নিজের ব্যাটিংয়ের ছন্দ ফিরে পাওয়ার প্রয়োজন, অন্যদিকে ইউসুফের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের পরামর্শ। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দীর্ঘ ইনিংস খেলার সুযোগ একজন ব্যাটসম্যানকে ধৈর্য, মনোযোগ ও ইনিংস গড়ে তোলার অভ্যাস ফিরিয়ে দিতে পারে। আবার টেকনিক্যাল দুর্বলতা চিহ্নিত না করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে নামলে প্রত্যাশিত উন্নতি নাও আসতে পারে। বাবরের ক্ষেত্রে কোনটি বেশি কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এর মধ্যে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সূচিও বেশ ব্যস্ত। আগামী ৯ নভেম্বর থেকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ খেলবে দলটি। এই সিরিজের আগে বাবরের ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাস ও ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সীমিত ওভারের ক্রিকেটের পাশাপাশি টেস্টেও অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর ওপর দলের প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রায় ১৭ হাজার আন্তর্জাতিক রান করা মোহাম্মদ ইউসুফ নিজেও জানেন, একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানের জন্য টেকনিকের সামান্য বিচ্যুতিও কতটা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শুধু প্রতিভা নয়, সঠিক অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের ভুল সংশোধনের মানসিকতাও প্রয়োজন। বাবরের সামর্থ্য নিয়ে ইউসুফের কোনো সংশয় নেই। বরং তাঁর মতে, যথাযথ পরিচর্যা পেলে বাবর আবারও নিজের হারানো ছন্দ ফিরে পেতে পারেন।
এখন দেখার বিষয়, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ও বাবর নিজে কোন পথ বেছে নেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নিয়ে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা করবেন, নাকি সাময়িক বিরতি নিয়ে বিদেশের বিশেষায়িত একাডেমিতে টেকনিক নিয়ে কাজ করবেন? সিদ্ধান্তটি শুধু তাঁর পরবর্তী কয়েকটি ইনিংসের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাবরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ নতুন করে দেওয়া এবং সমালোচনার জবাব ব্যাট হাতেই দেওয়া।


