বগুড়ার ধুনট উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় স্বামীর বাড়ির বারান্দা থেকে ২০ বছর বয়সী গৃহবধূ নাম্মি আকতার নিপার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরদেহের পাশেই তিন মাস বয়সী ছেলে নাহিদ কান্নারত অবস্থায় পড়ে ছিল। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার পর স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সন্ধ্যায় ধুনট উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের শিয়ালি গ্রামের ফোরহাদ মোল্লার বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুর কান্নার শব্দ শুনে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে তারা গিয়ে দেখতে পান, বারান্দায় নিপার নিথর দেহ পড়ে আছে এবং তার পাশে অসহায় অবস্থায় কাঁদছে ছোট্ট শিশু নাহিদ। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে নিহতের পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়।
খবর পেয়ে নিপার মা-বাবা ও স্বজনরা ঘটনাস্থলে এসে প্রথমে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে ধুনট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে মরদেহ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় ময়নাতদন্তের জন্য।
নিহত নিপা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বড়ইটালী গ্রামের লাল মিয়া প্রামাণিকের মেয়ে। প্রায় তিন বছর আগে ধুনট উপজেলার শিয়ালি গ্রামের বাহাদুর মোল্লার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তিন মাস আগে তাদের ঘরে নাহিদ নামে এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিয়ের পর থেকেই অভাব-অনটন এবং পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ লেগে থাকত। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের দাবি, বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল।
ঘটনার আগের দিন বুধবার (১৫ জুলাই) সকাল ৮টার দিকে বাহাদুর মোল্লা স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি বড়ইটালী গ্রামে যান। সেখানে স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে আবার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বিকেল ৫টার দিকে স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর, রাত প্রায় ৮টার দিকে প্রতিবেশীরা ফোন করে নিপার পরিবারকে জানান যে, তিনি ঘরের তিরের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা জানান, নিপার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গেছেন এবং তিন মাসের শিশুটিকে মায়ের মরদেহের পাশেই রেখে গেছেন।
রাত ১০টার দিকে নিপার স্বজনরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ এসে মরদেহ জব্দ করে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
এ ঘটনায় নিহতের মা জেলেখা বেগম ধুনট থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নিপার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার স্বামী পেশায় একজন অটোরিকশাচালক এবং পারিবারিক কলহের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর থেকেই নিহতের স্বামীসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য বাড়িতে নেই। তাদের খোঁজে পুলিশ কাজ করছে। তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্তে যদি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মায়ের মরদেহের পাশে তিন মাসের একটি শিশুকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখার দৃশ্য অনেককেই আবেগাপ্লুত করেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।