ময়মনসিংহের ভালুকায় ফেসবুক লাইভে ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে ভুক্তভোগী’ বলে ক্ষোভ প্রকাশের পর গ্রেপ্তার হওয়া নারী ব্যবসায়ী সাথী আক্তার (৩০) জামিন পেয়েছেন। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে শুনানি শেষে ৫০০ টাকার মুচলেকায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। জামিনের আদেশ দেন ময়মনসিংহের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদুল ইসলাম।
ময়মনসিংহ আদালতের পরিদর্শক পিএসএম মোস্তাছিনুর রহমান জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বুধবার সাথী আক্তারকে আদালতে হাজির করার নির্ধারিত দিন ছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তাঁর পক্ষে জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। শুনানি শেষে আদালত ৫০০ টাকার মুচলেকায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। পরে আদালতের হাজতখানা থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল।
সাথী আক্তার ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকার খাদিজা প্যালেস মার্কেটে ‘সাথী বিউটি পার্লার’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তিনি স্থানীয় আমজাদ আলীর মেয়ে। নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ফেসবুক লাইভে দেওয়া তাঁর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ
ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার (২৫ অক্টোবর)। ওই দিন বেলা ২টার দিকে ‘সাথী মেকওভার’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে পরপর দুটি লাইভ ভিডিও প্রচার করেন সাথী আক্তার। ভিডিও দুটির দৈর্ঘ্য ছিল যথাক্রমে ৫ মিনিট ২২ সেকেন্ড ও ৮ মিনিট ৮ সেকেন্ড।
ভিডিওতে তিনি নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে ভুক্তভোগী।’ তাঁর এই মন্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
ভিডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করেন এবং ঘটনার বিচার দাবি করেন। এ সময় এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হস্তক্ষেপ করে।
পুলিশ হেফাজত থেকে আদালতে
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাথী আক্তারকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরদিন সোমবার তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারা মূলত কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুলিশকে আগাম গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়। তবে এ ধারায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে সেই পদক্ষেপের আইনগত ভিত্তি ও পরবর্তী প্রক্রিয়া প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
গ্রেপ্তারের দুই দিন পর বুধবার আদালতে হাজির করা হলে সাথী আক্তারের জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হয়। শুনানি শেষে বিচারক তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। ফলে গ্রেপ্তারের পর দুই দিনের মাথায় আদালতের আদেশে তাঁর মুক্তির পথ তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন
সাথী আক্তারের ঘটনাটি স্থানীয় ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত বক্তব্যের প্রভাব—এই তিনটি বিষয়কে সামনে এনেছে। নিজের প্রতিষ্ঠানে চুরির অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। পরে সেই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগের প্রকৃতি, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যের কারণে উত্তেজনা তৈরি হলে তা মোকাবিলায় আইনসম্মত ও সংযত পদক্ষেপ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সাথী আক্তারের জামিন মঞ্জুর হওয়া তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়; এটি আদালতের একটি অন্তর্বর্তী আদেশ। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে।


