বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি অনেকটাই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর। শিল্পকারখানা, কৃষি, পরিবহন, বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্বালানি নিরাপত্তা একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। অথচ দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এই পরিস্থিতির দায় কোনো একটি সরকার বা একটি সময়পর্বের ওপর এককভাবে চাপিয়ে দিলে সমস্যাটির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। দীর্ঘদিনের নীতিগত সিদ্ধান্ত, জ্বালানি পরিকল্পনায় অসামঞ্জস্য, আমদানিনির্ভরতা এবং পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি—সব মিলিয়েই বর্তমান সংকটের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার দেশের তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। সে সময় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান ছিল। দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে এবং দেশের বিদ্যুতায়নের পরিধিও বিস্তৃত হয়।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি তৈরি হয় একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এসব কেন্দ্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় দেশীয় গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির নিশ্চয়তা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় আমদানিকৃত এলএনজি, কয়লা ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হলে এই নির্ভরতা যে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি প্রাথমিক জ্বালানির উৎস নিশ্চিত করা যেত, তাহলে উৎপাদন অবকাঠামো অনেক বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতো। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয়েছে একদিকে, আর জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে অন্যদিকে। এই সমন্বয়হীনতা শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সামনে তাই ছিল দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে আগের সময়ের অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিতর্কিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কিন্তু সংস্কার, পুনর্মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতার উদ্যোগের সঙ্গে জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় সব ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে করা সম্ভব হয়নি। আগের সময়ে নেওয়া কিছু উদ্যোগ স্থগিত বা বাতিলের পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর না হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়ে।
গ্যাস অনুসন্ধানে কূপ খননের পরিকল্পনা, নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ এবং দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপের গতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে আমদানিনির্ভরতার চাপ কমানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। একই সময়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত সতর্কতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও তার প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে সেই জমে থাকা সমস্যার চাপ সামলাতে হচ্ছে রাজনৈতিক সরকারকে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার ডিজেল বা অন্যান্য তরল জ্বালানির সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে পরিচালন ব্যয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরবরাহব্যবস্থা।
এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিল্পে উৎপাদন কমলে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে চাপ পড়ে। কৃষিতে সেচ ব্যাহত হলে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন খাতে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদরে গিয়ে পড়ে। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না; সেই কেন্দ্রগুলো চালানোর মতো নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একইভাবে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। দেশীয় গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানো, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা উন্নত করা, আমদানির উৎস বহুমুখী করা এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে প্রাথমিক জ্বালানির পরিকল্পনার সমন্বয় করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে বিনিয়োগ ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়ে। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম থাকলে তা তদন্ত ও সংশোধনের ব্যবস্থা থাকতে হবে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার কারণে দেশের জরুরি জ্বালানি সরবরাহ যেন বিপর্যস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান সংকট তাই কেবল বিদ্যুৎ বা জ্বালানির ঘাটতির গল্প নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহিতা এবং নীতির ধারাবাহিকতার পরীক্ষাও। অতীতের ভুলের দায় নির্ধারণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তার চেয়েও জরুরি হলো, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন সক্ষমতা, প্রাথমিক জ্বালানি, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ—সবকিছু একই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হবে।
সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। আর অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাতও অনিবার্যভাবে বাড়বে। তাই দায় নির্ধারণের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি স্থিতিশীল জাতীয় কৌশল।



