খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪০ পিএম
নেত্রকোণায় চাহিদার তুলনায় তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। জেলাজুড়ে গ্রাহক পর্যায়ে দিন-রাত মিলিয়ে গড়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়েছে। টানা বিদ্যুৎহীনতায় ফুঁসে উঠছেন গ্রাহকেরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অফিসে হামলা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাঞ্ছিত হওয়ার চরম আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের কাছে জরুরি নিরাপত্তার আবেদন জানিয়েছে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, লোডশেডিংয়ের এই সংকট কাটাতে বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জেলার মূল বিদ্যুৎ অফিস ও বিভিন্ন উপকেন্দ্রগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ প্রশাসনকে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার মো. আকরাম হোসেন জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে পুরো সংকটের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। নেত্রকোণা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের অধীনে থাকা নয়টি ৩৩ কেভি ফিডারের মাধ্যমে নেত্রকোণার ১০টি উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দৈনিক বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ১৫৭ মেগাওয়াট। তবে গত কিছুদিন ধরে প্রাপ্তির পরিমাণ চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
কয়েক দিনের ঘাটতির চিত্রে দেখা যায়, ৭ আগস্ট রাত ১টায় ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে মাত্র ৫৫ মেগাওয়াট। ৮ আগস্ট বিকেল ৫টায় ১২০ মেগাওয়াটের জায়গায় সরবরাহ আসে ৬৩ মেগাওয়াট। ৯ আগস্ট রাত ১১টায় ১২৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মেলে মাত্র ৬০ মেগাওয়াট।
দীর্ঘ সময় পর ১১ কেভি ফিডার চালু করা হলে সাধারণ গ্রাহকদের ঘরবাড়িতে ফ্রিজ, পানির পাম্প ও আইপিএস একসঙ্গে চালু হয়ে যায়। ফলে মুহূর্তেই বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দেড় গুণ বেড়ে যায়। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নেয়।
ময়মনসিংহ অঞ্চলে উৎপাদন ঘাটতির পেছনে মূলত তিনটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের আংশিক বা অকার্যকর অবস্থাকে দায়ী করা হচ্ছে। এগুলো হলো—গাজীপুরের শ্রীপুরের বরমীতে অবস্থিত বিআর পাওয়ারজেনের ১৬০ মেগাওয়াট প্লান্ট, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট এবং আরপিসিএল ময়মনসিংহ বিদ্যুৎকেন্দ্র। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দাবি, গাজীপুরের বরমীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যদি তার পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যায়, তবে নেত্রকোণা গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ না পেয়ে মাঠপর্যায়ে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। ফোনে কর্মকর্তাদের গালিগালাজের পাশাপাশি অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুরের নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি গ্রাহকদের কাছে বকেয়া বিল আদায় করতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না দেওয়া পর্যন্ত সব উপকেন্দ্রে প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দুর্দশা চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক সুজন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিনে-রাতে মিলাইয়া ৪ থেইক্যা ৫ ঘণ্টা কারেন্ট থাহে। গরমে রাতে ঘুমাইতে পারি না, বাচ্চাদের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার জোগাড়।” আটপাড়ার মোগলহাট্রা গ্রামের আব্দুল গনি জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মেলে, তা-ও আবার ১০-২০ মিনিট করে দফায় দফায়।
নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম আকরাম হোসেন বলেন, “গ্রাহকদের দুর্ভোগ আমরা বুঝতে পারছি। সরবরাহ বাড়াতে আমরা সর্বোচ্চ যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি।” অন্যদিকে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কথা বলা হয়েছে এবং অতি দ্রুতই পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্তব্য